সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষার্থীর সংখ্যা। কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অবকাঠামো, আসনসংখ্যা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায় আসেনি তেমন কোনো পরিবর্তন। বর্তমানে ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪০০টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান এই কেন্দ্রটি এখন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শব্দদূষণ, বহিরাগত প্রবেশ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাকিবুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভবনগুলো অত্যন্ত পুরোনো হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী অবকাঠামো ও সেবার উন্নয়ন হয়নি। প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর তুলনায় সিটিং ক্যাপাসিটি খুবই কম। আন্তর্জাতিক গবেষণা ডেটাবেইসে প্রবেশাধিকার সীমিত, ই-রিসোর্সও পর্যাপ্ত নয়। প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো শব্দদূষণ। পাঠকক্ষে বসেও বাইরের বিভিন্ন কর্মসূচির মাইক, স্লোগান, যানবাহনের হর্ন এবং অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে নীরব পরিবেশে পড়াশোনা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু বাইরের শব্দই নয়, গ্রন্থাগারের ভেতরেও অনেক সময় গ্রুপ স্টাডির নামে ফিসফিস আলোচনা, মোবাইল ফোনে কথা বলা কিংবা চেয়ার-টেবিল সরানোর শব্দে পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কার্যকর মনিটরিং ও সাউন্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থার অভাবও এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘রিডিং রুমে এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা না থাকায় এয়ার কুলার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এসব এয়ার কুলার থেকে উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টি হয় এবং পর্যাপ্ত শীতলতা নিশ্চিত না হওয়ায় একই সঙ্গে ফ্যানও চালিয়ে রাখতে হয়। এতে পাঠকক্ষে শব্দদূষণ যেমন বাড়ে, তেমনি দীর্ঘ সময় স্বাচ্ছন্দ্যে বসে পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আধুনিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এমন পরিবেশ কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
বহিরাগত প্রবেশ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। আইডি কার্ড প্রদর্শনের নিয়ম থাকলেও সেটি সব সময় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না। ফলে বহিরাগতদের কারণে অনেক সময় প্রকৃত শিক্ষার্থীরা আসন না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ করেছেন নিয়মিত ব্যবহারকারীরা।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তোফায়েল হোসেন বলেন, ‘প্রায় চার বছর ধরে এই লাইব্রেরিতে আসা-যাওয়া করি। কিন্তু কখনো দেখিনি নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে কয়েক দিন কড়াকড়ি করা হলেও পরে কোনো এক অজানা কারণে সেটি আর দীর্ঘস্থায়ী হয় না।’
বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে আরএফআইডি গেট বা স্মার্ট কার্ডভিত্তিক প্রবেশ ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি সুবিধা পাবে বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ধারাবাহিকভাবে সাইকেল চুরির ঘটনাও ঘটছে বলেও জানান শিক্ষার্থীরা। গত এক বছরে অন্তত ১০টির বেশি সাইকেল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিরাপদ সাইকেল গ্যারেজ, পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল জুনায়েদ বলেন, ‘২০২৪ সালের শেষের দিকে লাইব্রেরির সামনে তালাবদ্ধ করে রাখা আমার সাইকেল চুরি হয়ে যায়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখেও চোরকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, কারণ ক্যামেরার ছবি ছিল ঝাপসা। ফলে আর কিছুই করার ছিল না। এমন ঘটনা শুধু আমার নয়, আরও অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটেছে।’
এসব বিষয়ে গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘পুরোনো ভবন হওয়ায় গ্লাস লাগানো থাকলেও শব্দ পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেগা প্রকল্পের আওতায় নতুন বহুতল গ্রন্থাগার ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ভবন হলে সাউন্ড প্রুফিং, আধুনিক রিডিং স্পেস, উন্নত প্রযুক্তি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে আরএফআইডি গেট স্থাপনের বিষয়ে গ্রন্থাগারিক জানান, সিন্ডিকেটে ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত থাকায় এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এছাড়া আলোকসজ্জা উন্নয়নে নতুন লাইট স্থাপন এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপগ্রন্থাগারিক বলেন, ‘মেট্রোরেল নির্মাণের সময় আমরা এই রুট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। তখন আমাদের বলা হয়েছিল, মেট্রোরেলের কোনো শব্দ হবে না। কিন্তু এখন বাস্তবতা হলো সেই শব্দ লাইব্রেরির ভেতর পর্যন্ত শোনা যায়।’
উপগ্রন্থাগারিক আরও জানান, লাইব্রেরির সমস্যার বড় দুটি কারণ হলো বাজেট সংকট এবং কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম। সীমিত বাজেটের মধ্যেও যদি অনিয়ম হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পাঠকক্ষ সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, ‘আসলে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির অবস্থানই এমন জায়গায়, যার পাশ দিয়ে প্রধান সড়ক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পিজি হাসপাতাল, বারডেমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাম্বুলেন্স ও যানবাহন চলাচল করে। ফলে বাইরের শব্দ লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে এবং এটি একটি পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতা।’
উম্মে সালমা আরও জানান, ইতিমধ্যে লাইব্রেরির আলোকস্বল্পতা দূরীকরণে প্রায় ৩০০টি এলইডি লাইট স্থাপন করা হয়েছে। নিচতলায় ২টি ওয়াশরুম নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে। তবে সাইকেল গ্যারেজ নির্মাণ এবং সাউন্ডপ্রুফ গ্লাস স্থাপনের প্রস্তাব প্রশাসনের কাছে দেওয়া হলেও এখনো সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়নি।
এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা প্রসঙ্গে উম্মে সালমা বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন হলের রিডিং রুমে এসি স্থাপনের কাজ করছিলাম। ইতিমধ্যে কয়েকটি হলে এসি স্থাপনও করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন আমাদের জানিয়েছে, এগুলোর ফলে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যাবে, আর সেই পরিমাণ ব্যয় ইউজিসি থেকে দেওয়া হয় না। আমরা কেন্দ্রীয় মসজিদে এসি বসিয়ে রেখেছি, শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় একটি সুবিধা কেবল বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে চালু করা যাচ্ছে না।’
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘সাউন্ড প্রুফিংয়ের সমস্যাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি বিষয়। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় এখানে নানা কর্মসূচি ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, ফলে শব্দ নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’
উপাচার্য আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বেশ কয়েকটি নতুন ভবন নির্মাণ হবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নতুন বহুতল ভবন নির্মাণকে আমরা অগ্রাধিকার দিতে চাই। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন, গবেষণাবান্ধব ও পর্যাপ্ত আসনসংবলিত একটি গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীরা পাবে। একই সঙ্গে সাউন্ডপ্রুফ ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা আশা করছি, নতুন ভবন নির্মিত হলে বর্তমানে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের যেসব কাঠামোগত ও পরিবেশগত সমস্যা রয়েছে, তার অধিকাংশই দূর হবে এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তিরও অবসান ঘটবে।’