ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, নির্বাচিত হলে আবাসনসংকট নিরসন, মানসম্মত খাবার নিশ্চিতকরণ, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সংস্কার, গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহারে ৩৬ট দফা দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্বাচনে জয়ের ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়। এরপর আবারও থেমে যায়। ছয় বছর পর ২০২৫ সালে আবারও ডাকসু নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট বিশাল জয় পায়। এই নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। এখন জোটের ইশতেহার বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে ডাকসু বেশি মনোযোগ দিয়েছে সেমিনার, কর্মশালা এবং বিভিন্ন নিয়মিত কর্মসূচি আয়োজনের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পুরোনো সমস্যা ক্যানটিনের খাবারের মান। খাবারের উচ্চমূল্য, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিম্নমান এবং বৈচিত্র্যের অভাব নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ডাকসুর ইশতেহারে পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের তালিকা প্রণয়ন, নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি অনুষদে মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল। যদিও কিছু ক্যানটিনে সীমিত পরিবর্তন এসেছে, শিক্ষার্থীদের মতে তা দৃশ্যমান বা টেকসই নয়।
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফারহাদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নির্বাচনের পর থেকে আমরা ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে সমাধানের চেষ্টা করছি; বিশেষ করে হলের খাবারের মানোন্নয়ন, আবাসনসংকট নিরসন, প্রশাসনিক সেবার আধুনিকীকরণ এবং পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।’
তবে মাস্টারদা সূর্য সেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রাকিব মিয়া বললেন, ‘আমাদের হলে ডাকসু নির্বাচনের পর খাবারের দাম বাড়লেও মান বাড়েনি, বরং আরও কমেছে। এ বিষয়ে আমরা হল সংসদের সঙ্গে অনেকবার কথা বলেছি। বাস্তব পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্যানটিনে এখন নিম্নমানের ভাত, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং একই ধরনের খাবার বারবার দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়েই খাচ্ছে।’
এদিকে এই হলসহ কয়েকটি হলেন শিক্ষার্থীরা জানালেন, শুধু খাবারের মান নয়, হলের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ আছে। ওয়াশরুমের পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং সিট সমস্যার মতো বিষয়গুলোর এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। অনেক শিক্ষার্থী এখনো অস্বস্তিকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
আবাসিক হলের সিট-সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অবৈধভাবে অবস্থানকারী অনেকে হল ছাড়ায় ছেলেদের হলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ছাত্রীদের জন্য সিট-সংকট এখনো তীব্র। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে প্রথম বর্ষ থেকে বৈধ সিট নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অনাবাসিক ছাত্রীদের জন্য মাসিক তিন হাজার টাকা ভাতা চালুর মতো সাময়িক উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক শিক্ষার্থীর মতে, এই অর্থ অপ্রতুল।
এদিকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অনুমোদিত ২ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি ছাত্র হল ও চারটি ছাত্রী হল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চীনের অর্থায়নে আরও একটি ছাত্রী হল অনুমোদন পেয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। তবে এখনো প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
প্রশাসনিক জটিলতা নিয়েও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অসদাচরণের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। ডাকসু ইশতেহারে ‘পেপারলেস রেজিস্ট্রার বিল্ডিং’ এবং উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। সম্প্রতি নথি যাচাই জটিলতায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হারানোর ঘটনাও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। একাডেমিক ক্ষেত্রেও অসন্তোষ বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কিছু শিক্ষকের মধ্যে একাডেমিক দায়বদ্ধতার অভাব, বিতর্কিত নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং কার্যকর মেন্টরশিপ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় গ্রন্থাগার ডিজিটালাইজেশনের পরিকল্পনাও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং আধুনিক গবেষণাগার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত ৮ মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে।
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিয়াদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনের আগে যে ধরনের উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তার বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধীরে ধীরে হতাশা তৈরি হচ্ছে। অনেকেরই মনে হচ্ছে, ইশতেহারের বড় একটি অংশ এখনো শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।’