হোম > শিক্ষা > ক্যাম্পাস

সাকিবের অপেক্ষায় বিশ্বের ১০ বিশ্ববিদ্যালয়

সানজিদা আফরিন

সাকিব আল মুনতাসি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ৪৪তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী সাকিব আল মুনতাসির একসঙ্গে বিশ্বের ১০ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ। এগুলোর মধ্যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং আটটি থেকে স্নাতকোত্তরের সুযোগ আসে। শেষ পর্যন্ত গবেষণার আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় সৌদি আরবের কিং ফাহাদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলসে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি বেছে নেন তিনি। পেয়েছেন সম্পূর্ণ অর্থায়নের বৃত্তিও।

একের পর এক সুযোগ

সাকিবের মাস্টার্সের সুযোগের তালিকাটিও কম চমকপ্রদ নয়। সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব বোরাসে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ইনোভেশন, যুক্তরাষ্ট্রের টুলেন ইউনিভার্সিটিতে ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ায় ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলে সাসটেইনেবল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির সুযোগ আসে তাঁর।

যুক্তরাজ্যের কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে সাসটেইনেবল ফ্যাশন এবং হেরিয়ট-ওয়াট ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাশন অ্যান্ড টেক্সটাইলস ম্যানেজমেন্টেও সুযোগ পেয়েছেন তিনি। কোথাও পেয়েছেন নির্দিষ্ট অঙ্কের বৃত্তি, কোথাও গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা।

শেষ সেমিস্টারেই শুরু

বিদেশে পড়ার ইচ্ছা অবশ্য নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ছিল সেই স্বপ্ন। তবে স্বপ্নকে পরিকল্পনায় রূপ দেন স্নাতকের শেষ সেমিস্টারে। সাধারণ ক্রমটি হলো স্নাতক, এরপর মাস্টার্স, তারপর পিএইচডি। সাকিব সেই প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে স্নাতক শেষ করেই সরাসরি পিএইচডির সুযোগ তৈরি করেছেন। এর পেছনে ছিল গবেষণার অভিজ্ঞতা, একাডেমিক প্রকাশনা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয়। তাঁর মতে, আবেদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা ছিল মাঠপর্যায়ের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা।

ক্লাসরুমের বাইরের শিক্ষা

বুটেক্সে পড়ার সময় শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকেননি সাকিব। পড়াশোনার পাশাপাশি সক্রিয় ছিলেন বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনে। স্নাতক জীবনের শেষ ভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন বুটেক্স বিজনেস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে। ২০২৪ সালে বুটেক্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ছিলেন ‘হেড অব ভলান্টিয়ার্স’। এ ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ১০টির বেশি সংগঠনে যুক্ত ছিলেন তিনি। ক্লাবের নানা আয়োজন, প্রতিযোগিতা, সেমিনার ও কর্মশালায় কাজ করতে গিয়ে শিখেছেন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, দল পরিচালনা ও কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল। গড়ে উঠেছে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরির দক্ষতাও। সাকিবের ভাষায়, এসব অভিজ্ঞতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে সমৃদ্ধ করেনি; স্কলারশিপের চূড়ান্ত ভাইভা বোর্ডেও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

চাকরির অভিজ্ঞতাও শক্তি

স্নাতক শেষে কর্মজীবনেও থেমে থাকেননি তিনি। কাজ করেছেন রিড কনসালট্যান্সি বাংলাদেশে সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড সার্কুলারিটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। সেখানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডের হয়ে কাজ করার সুযোগ পান। দেশের ভেতর ও বাইরে ৫০টির বেশি টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদনসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তায় যুক্ত ছিলেন তিনি। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর উচ্চশিক্ষার আবেদনে যোগ করেছে আলাদা মাত্রা। একাডেমিক জ্ঞানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে।

এক সপ্তাহের প্রস্তুতি

উচ্চশিক্ষার আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আইইএলটিএস। সেখানেও সাকিবের গল্পটা একটু অন্য রকম। ফুলটাইম চাকরির কারণে নিয়মিত প্রস্তুতির সময় বের করা কঠিন ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এক সপ্তাহের কম ছুটি পান তিনি। সেই অল্প সময়ে নেমে পড়েন প্রস্তুতিতে। কোনো কোচিং নয়, কারও সরাসরি তত্ত্বাবধানও নয়। নিজের মতো প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসেন। ফল—আইইএলটিএসে ৭.৫।

টেক্সটাইল থেকে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি বিষয় বদলের কারণ কানতে চাইলে সাকিব জানায়, টেক্সটাইল বিষয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নের বৃত্তির সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাই অনেক শিক্ষার্থী পলিমার সায়েন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স বা ডিজাইন-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুযোগ খোঁজেন। তাঁর নিজের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ছিল গবেষণার মিলের। কিং ফাহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের গবেষণার ক্ষেত্রের সঙ্গে তাঁর আগ্রহের মিল রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশ্বমানের গবেষণাগার, বৈশ্বিক অবস্থান এবং সম্পূর্ণ অর্থায়নে পড়াশোনার সুযোগ তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।

ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস আর ধারাবাহিকতা

আন্তর্জাতিক বৃত্তিতে আবেদন করতে চান—এমন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সাকিবের পরামর্শ সহজ। ধৈর্য ধরতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। শুধু আইইএলটিএসের স্কোর কিংবা ভালো ফলের ওপর নির্ভর করলে হবে না। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি পেশাগত অভিজ্ঞতা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও নিজেকে যুক্ত করতে হবে। তাঁর মতে, একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে পারে।

সামনে এখন নতুন পথ। কেএফইউপিএমে পিএইচডির পাশাপাশি গবেষণায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে চান সাকিব। তবে স্বপ্ন শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। ভবিষ্যতে দেশে ফিরে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি গড়ে তুলতে চান একটি গবেষণা কমিউনিটি। যেখানে শিক্ষার্থীরা স্নাতক পর্যায় থেকে গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। শিখবে গবেষণাপত্র লেখা। তৈরি করবে নিজেদের গবেষণার অভিজ্ঞতা।