ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী হলের ক্যানটিনের খাবারে পোকামাকড়, কেঁচো, জোঁক এমনকি ব্লেডের মতো বিপজ্জনক অখাদ্য বস্তু পাওয়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব ঘটনায় কখনো জরিমানা, কখনো ক্যানটিন বন্ধসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও খাবারের মান এবং পরিচ্ছন্নতার সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ফলে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার পাওয়া নিয়ে আবাসিক শিক্ষার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকদের উদ্বেগ কাটছে না।
হলে থাকা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন খাবারের অন্যতম প্রধান উৎস ক্যানটিন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সেখানকার খাবারের মান নিয়ে তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, একের পর এক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কেন ক্যানটিনের খাবারে অস্বাস্থ্যকর বস্তু পাওয়ার ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না? তাঁদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যবিধি মানা বা পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও বিশেষ উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
গত ৩০ জুন শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী আল আরশাদ হাসান ক্যানটিনে ব্যবহৃত পানির জগ নিয়ে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, ক্যানটিনের কর্মচারীরা রান্নাঘরের ওয়াশরুমে গোসলের কাজে ব্যবহৃত জগ পরিষ্কার না করেই খাবারের সময় পানি পরিবেশন করতেন। অভিযোগটি তোলার পর হল সংসদের পক্ষ থেকে ক্যানটিন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। হল প্রশাসন ক্যানটিন পরিচালককে বরখাস্ত করে। পরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে নতুন পরিচালকের মাধ্যমে ক্যানটিনটি আবার চালু করা হয়। তবে এই ঘটনার কিছুদিন পর ২১ জুলাই রাতে এই হলেরই পুরাতন ভবনের ক্যানটিনে পুঁইশাক ও মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় খাবারে কেঁচো পান এক শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় ক্যানটিন পরিচালককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে হল প্রশাসন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে তাঁকে সতর্ক করা হয়।
১৬ জুলাই জসীমউদ্দীন হলের ক্যানটিনে পরিবেশিত হাঁসের মাংসের তরকারিতে ব্লেড পান হলের এক শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় ক্যানটিন পরিচালককে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার পর সতর্ক করা হয়। এ ঘটনার আগেও জসীমউদ্দীন হলের ক্যানটিনের খাবারে জোঁক এবং কাপড়ের টুকরা পাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
জসীমউদ্দীন হলের ঘটনার ১১ দিন আগে গত ৫ জুলাই শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের মূল ক্যানটিনের তরকারিতে ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেন এক শিক্ষার্থী। অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট ক্যানটিন তালাবদ্ধ করে হল সংসদ। ১২ জুলাই বিজয় একাত্তর হলের ক্যানটিনে পরিবেশিত সবজির মধ্যে বাসন মাজার স্ক্রাবারের অংশ পাওয়ার কথা জানান এক শিক্ষার্থী। ২০ জুলাই একই হলের ক্যানটিনের খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগ করেন আরেক শিক্ষার্থী। সর্বশেষ গত শনিবার মাস্টারদা সূর্য সেন হল ক্যানটিনে খাসির ‘ফ্যাপসা’র (ফুসফুস) তরকারিতে তেলাপোকা পাওয়ার অভিযোগ করেছেন হলের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনার আগেও বিভিন্ন হলের ক্যানটিনের খাবারে দড়ি, রাবার ব্যান্ড, টাকার নোটের অংশ, মাছি, কাঁকড়ার অংশ এবং বিভিন্ন পোকামাকড় পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পুনরাবৃত্তি বন্ধ হচ্ছে না।
বারবার খাবারে অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক বস্তু পাওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, ক্যানটিন কর্মচারীদের অসচেতনতা এবং দায়িত্ববোধের অভাবের পাশাপাশি হল প্রশাসন এবং হল সংসদের যথাযথ তদারকির অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত খাবারের নামে অখাদ্য খাচ্ছে। কেঁচো, শামুক, পোকা, পচা ও বাসি খাবার নিত্যদিনের ঘটনা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ করে আল আমিন বলেন, এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো। হল সংসদ কিছুটা চেষ্টা করলেও তারা শতভাগ সফল নয়। খাবারের এই সমস্যার সমাধানে হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে এসব খাবার খায়। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতি এবং হল সংসদের অবহেলার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
খাবারে পোকামাকড়, ব্লেড কিংবা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর বস্তু পাওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ক্যানটিনের খাবারে পোকামাকড়, ব্লেড কিংবা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর বস্তু পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের খাবার খেলে বিভিন্ন জীবাণুবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক তাৎক্ষণিক ক্ষতি হতে পারে। তাই ক্যানটিন পরিচালনাকারী, হল প্রশাসন এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক হতে হবে।
ক্যানটিনের খাবারের সার্বিক পুষ্টিগুণ সম্পর্কে অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে যে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে, তাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ নেই। শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফলমূল প্রয়োজন, যা তারা পাচ্ছে না। ক্যানটিনের ডাল খুব পাতলা, তাই সেখান থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন মিলছে না। মাছ-মাংসের টুকরাও এত ছোট যে তা দিয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটানো অসম্ভব।
ক্যানটিনের খাবারে ব্লেড পাওয়ার বিষয়ে জসীমউদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এস. এম আরিফ মাহমুদ বলেন, ঘটনার পর গঠিত কমিটির তদন্তে জানা যায়, রান্নার সময় বস্তার সুতা কাটতে ব্যবহৃত একটি ব্লেড অসাবধানতাবশত খাবারে পড়ে যায়। এ ঘটনায় ক্যানটিন পরিচালককে জরিমানা এবং এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা ঘটার কারণ ও সমাধান সম্পর্কে প্রাধ্যক্ষ বলেন, মূল সমস্যাটা হয় রান্নাঘরেই। বাবুর্চিদের আরও সচেতন করতে হবে এবং রান্নাঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ব্লেডের মতো অপ্রয়োজনীয় ধারালো বস্তু রান্নাঘরে রাখার বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। জসীমউদ্দীন হলে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার ক্যাটারার পরিবর্তন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা এবং খাবারে তেলাপোকা পাওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খাবারের মান নিশ্চিত করতে এবং তদারকি জোরদারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, রান্নাঘরের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে এবং ক্যানটিন পরিচালকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আবারও এ ধরনের ঘটনা ঘটলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, হল ক্যানটিনের খাবারে ব্লেড, পোকামাকড় বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর বস্তু পাওয়ার ঘটনায় কোনো ছাড় নয়। এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনকে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে চুক্তি বাতিল করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা এড়াতে ক্যানটিন পরিচালনা ও তদারকিতে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।