শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা
শিক্ষা ছুটি শেষে যোগদান না করা শিক্ষকদের কাছ থেকে ছুটিকালীন বেতন-ভাতা ফেরত না নেওয়ায় দেশের ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে জনবলকাঠামোর বাইরে পদোন্নতি দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষতি ৪৭ কোটি টাকার বেশি।
এমন মোট ১৩২ ক্ষেত্রে অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে এই ২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে করা নিরীক্ষায়। এসব অনিয়মে মোট আর্থিক ক্ষতি ২ হাজার ৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার ৩০ টাকা। বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের ২৯ মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত এই নিরীক্ষা করা হয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ক্ষতি হওয়া টাকা আদায়ের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব- সম্পর্কিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই নিরীক্ষা পরিদর্শন প্রতিবেদন সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, এসব অডিট আপত্তি আগের প্রশাসনের আমলের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলেছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী অডিট আপত্তির জবাব দেবে। এরপর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে গতকাল রোববার জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ইউজিসি কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করবে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। যেসব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের আগের। এখন আমরা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে সতর্ক করছি।
তাদের বলা হচ্ছে, এ ধরনের নিরীক্ষা আপত্তি এলে ইউজিসি থেকে অর্থছাড়সহ অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৬০টি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। এ ছাড়া অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১১৬টি।
নিরীক্ষা করা ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)।
এই ২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগণের করের টাকা যাঁরা নয়ছয় করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এই ২৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশির ভাগ অনিয়ম হয়েছে বিভিন্ন খাতে বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও সম্মানী দেওয়া, ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় সরকারি বিধি না মেনে অর্থ ব্যয়ে। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষার ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা না দেওয়া, ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, কোটি টাকার মোবাইল বিল দেওয়ার মতো অনিয়ম হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী সবচেয়ে বড় অঙ্কের অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের ভবন নির্মাণে। এতে অনিয়মিতভাবে খরচ হয়েছে ৯৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ২ হাজার টাকা। ইউজিসি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের জনবল পৃথকভাবে শনাক্ত না থাকায় বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ের সঠিকতা নিরূপণ করা যায়নি। এতে ক্ষতি হয়েছে ১২০ কোটি ৫৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ইউজিসির মাধ্যমে যথাযথ ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ না করায় অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ৪১৬ কোটি ৪৩ লাখ ২১ হাজার টাকা। নিরীক্ষা অনুযায়ী এই ক্ষেত্রে অনিয়মের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ‘খণ্ডকালীন ভাতা’ দেওয়া হয়েছে। যদিও বিধি অনুযায়ী, খণ্ডকালীন ভাতা দেওয়ার সুযোগ নেই। এতে এক অর্থবছরে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭ কোটি টাকার বেশি। বিধিবহির্ভূতভাবে অবসর গ্রহণের বয়স ৫৯ বছরের অধিক গণনা করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও ছুটি নগদায়ন সুবিধা দেওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি ৯২ লাখ ৩৭ হাজার ১৪ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাস করা সত্ত্বেও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নির্ধারিত হার অপেক্ষা কম হারে বাড়ি ভাড়া কর্তন করায় ক্ষতি হয়েছে ২০ কোটি ৪২ লাখ ১৭ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় ক্ষতি ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৪ টাকা, অর্গানোগ্রাম-বহির্ভূত পদে পদোন্নতি দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৭ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৮ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মোবাইল ভাতা দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৮৮ টাকা। এ ছাড়া টেলিফোন বিল নগদায়ন ভাতা দেওয়ায় ক্ষতি ১ কোটি ৮৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৫৮ টাকা ক্ষতি। এর বাইরে শিক্ষকদের প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ভাতা দেওয়ায় ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫৪ টাকা, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বই ভাতা দেওয়ায় ১৯ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭৭ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ভর্তি ফরম বিক্রি এবং ভর্তি ফি বাবদ অর্জিত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে না দেখানোয় পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৬ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উৎস হতে প্রাপ্ত আয় বাজেটে না দেখানোয় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪৪ কোটি ৯১ লাখ ৩৮ হাজার ১৬৫ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা রাজস্ব বাজেট থেকে দেওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৫ কোটি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৫ টাকা।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাল ভাতা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৩ হাজার ৫৩৪ টাকা। এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ সমাপ্ত না করা সত্ত্বেও বিলম্ব জরিমানা আদায় না করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি ৫৮ কোটি ৪০ লাখ ৫২ হাজার ১৯৭ টাকা।
এ ছাড়া ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদোন্নতি, বাজেটের অতিরিক্ত খরচ, বিভিন্ন কাজে ভ্যাট কর্তন না করা, বিভিন্ন কাজে ঠিকাদারদের চুক্তির বাইরে বিল দেওয়া, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ এবং প্রতিস্থাপন কাজে অনিয়মিত ব্যয়, নিম্নমানের মূল উত্তরপত্র এবং পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা সত্ত্বেও অনিয়মিতভাবে বিল পরিশোধসহ শতাধিক ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।
এসব অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে অপারগতা জানান। তবে তাঁরা বলেছেন, এসব অনিয়ম তাঁদের দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময়ের। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁরা দায়িত্বে এসেছেন। নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা পদক্ষেপ নেবে।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের অডিট আপত্তির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। খোঁজ নেবেন।