হোম > শিক্ষা

অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ পেরিয়ে হার্ভার্ডে সায়মা

মিফতাহুল জান্নাত সায়মা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষার অফার লেটার পান। বিশ্বের সেরা তিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেন তিনি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এডুকেশনে লার্নিং ডিজাইন, ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি বিষয়ে পড়ছেন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আজকের পত্রিকার আনিসুল ইসলাম নাঈম।

আনিসুল ইসলাম নাঈম

মিফতাহুল জান্নাত সায়মা। ছবি: সংগৃহীত

মিফতাহুল জান্নাত সায়মা চট্টগ্রামের নন্দনকানন এলাকার মেয়ে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বোন বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার এবং ভাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছেন। বাবা ব্যবসায়ী এবং মা গৃহিণী। তাঁর মা-বাবার নিজেদের পড়াশোনার সুযোগ ছিল সীমিত। কিন্তু সন্তানদের শিক্ষার প্রশ্নে মা-বাবা ছিলেন সব সময় দৃঢ়। শৈশবে নির্দিষ্ট কোনো পেশার স্বপ্ন তাঁর ছিল না। কৌতূহল ছিল নানা দিকে। তবে সমাজে বৈষম্য কেন তৈরি হয়, মেয়েদের জীবনের সিদ্ধান্ত কেন অনেক সময় অন্যরা নিয়ে নেয়–একগুচ্ছ প্রশ্ন ভাবাত তাঁকে।

ইউরোপের ২৩ দেশে

সায়মা শিক্ষাজীবনের শুরু করেন ফুলকি সহজপাঠ বিদ্যালয়ে। তিনি ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে জিপিএ-৫ নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ)। সেখানে পলিটিকস, ফিলোসফি অ্যান্ড ইকোনমিকসে স্নাতক করেন, সঙ্গে ছিল কম্পিউটার সায়েন্স এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে মাইনর। স্নাতকের সময় একটি ফান্ডেড এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে ফ্রান্সের প্যারিসের ‘সায়েন্সেস পো’তে এক সেমিস্টার পড়ার সুযোগ পান। পড়াশোনার ফাঁকে ঘুরে দেখেন ইউরোপের ২৩টি দেশ। ভিন্ন দেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে কাছ থেকে দেখা তাঁর চিন্তার পরিধি অনেক বড় করেছে। ২০২৩ সালে ৩.৯০ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকের পাঠ শেষ করেন।

ক্লাসরুমের বাইরে

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বড় অংশজুড়ে ক্লাসের বাইরের কাজে যুক্ত ছিলেন সায়মা। বছর তিনেক প্রিক্যালকুলাসের মতো কোর্সে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং রাইটিং সেন্টারে টিউটর হিসেবে কাজ করেছেন। ছিলেন এআই ক্লাবের সভাপতি। এ ছাড়া মডেল ইউনাইটেড ন্যাশনস ও কয়েকটি সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণেও আগ্রহ ছিল তাঁর। ২০২২ সালে তাঁর প্রযোজিত চলচ্চিত্র ‘গিল্টি?’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্মমেকিং পুরস্কার পায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কমিউনিটির কাজ। কিশোর বয়সে চট্টগ্রামে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ শুরু করেন। পরে কাজ করেছেন মেয়েদের শিক্ষা, মাসিকজনিত স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও জীবিকা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে।

বিশ্বের সেরা তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে

বিদেশে পড়ার ইচ্ছা এক দিনে তৈরি হয়নি সায়মার। স্নাতকের সময় নানা দেশের সহপাঠী এবং ‘সায়েন্সেস পো’তে এক্সচেঞ্জ ছিল পথচলার প্রথম পাঠ। ফ্রান্সে গিয়ে বুঝতে পারেন, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া তাঁর জন্য অসম্ভব নয়। আবার কমিউনিটির কাজে গিয়ে বুঝেছেন, শুধু আবেগ দিয়ে বেশি দূর যাওয়া যায় না। শিক্ষাব্যবস্থা, নীতি, প্রযুক্তি আর লার্নিং ডিজাইন গভীরভাবে বুঝতে আরও প্রশিক্ষণ দরকার। বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনের সময় তিনি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে আবেদন করেননি। লক্ষ্য ছিল শুধু অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও হার্ভার্ড। ফলাফলে অক্সফোর্ডের দুটি, কেমব্রিজের দুটি এবং হার্ভার্ডের একটিসহ মোট পাঁচটি প্রোগ্রামের অফার আসে। তাঁর আইইএলটিএস স্কোর ছিল ৮.৫। সায়মার প্রথম অফার লেটার আসে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৬ জানুয়ারি রাতের সেই মুহূর্তটা আজও মনে আছে তাঁর। ‘অফার লেটারে নিজের নাম দেখে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। বারবার যাচাই করেছি, সত্যিই কি এটা আমাকেই পাঠানো হয়েছে! এরপর ফেব্রুয়ারিতে অক্সফোর্ড ও ৬ মার্চ হার্ভার্ড থেকেও অফার আসে। প্রতিটি অফারই আমার কাছে সমান আনন্দের’, যোগ করেন সায়মা।

কেন হার্ভার্ড

বিশ্বের সেরা তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে অফার লেটার পান সায়মা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেন। কারণ, হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এডুকেশনের লার্নিং ডিজাইন, ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি প্রোগ্রামটি তাঁর গবেষণার আগ্রহ, সামাজিক কাজ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য—সবকিছুর সঙ্গে মানানসই। অফার পেয়ে ফান্ডিং, আর্থিক নথিপত্র, আই-২০ ও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থী ভিসার আরেকটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরোতে হয়। এফ-১ ভিসা ইন্টারভিউ পর যেতে হয় অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসেসিংয়ে। শেষ পর্যন্ত মেলে ভিসা। ৩ আগস্ট থেকে তাঁর ক্লাস শুরু হয়।

পড়াশোনার বিষয়

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও লার্নিং ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সায়মা একটি কোর্সে টিচিং ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ক্রস-রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে প্রযুক্তি ও ডেটাবিষয়ক তিনটি কোর্স করছেন। একই সঙ্গে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে নিচ্ছেন একটি কৌশল (স্ট্র্যাটেজি) বিষয়ক কোর্স। তাঁর মতে, এই আন্তবিষয়ক পড়াশোনা তাঁকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, ডেটা, উদ্ভাবন, ব্যবসা ও কৌশলকে একসঙ্গে বুঝতে সহায়তা করছে।

বৃত্তিতে সুযোগ-সুবিধা

হার্ভার্ডে সায়মার পড়ার খরচ মিলেছে একাধিক উৎস থেকে। হার্ভার্ডের পক্ষ থেকে পেয়েছেন বারাকাত ফ্যামিলি ফেলোশিপ ও প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সহায়তা। সঙ্গে রয়েছে আগা খান ফাউন্ডেশনের ইন্টারন্যাশনাল স্কলারশিপ প্রোগ্রামের অর্থায়নও।

আবেদনে কী লাগে

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামের শর্ত আলাদা বলে জানান সায়মা। তাই সবার আগে প্রোগ্রামের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ভালোভাবে পড়তে হবে। আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণত লাগে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, সিভি, স্টেটমেন্ট অব পারপাস বা পার্সোনাল স্টেটমেন্ট, সুপারিশপত্র এবং ইংরেজি ভাষার দক্ষতার স্কোর। কোনো কোনো প্রোগ্রামে রাইটিং স্যাম্পল, রিসার্চ প্রপোজাল বা অতিরিক্ত রচনা চাওয়া হয়, কোনোটিতে ইন্টারভিউও হয়। অ্যাডমিশন কমিটি পুরো আবেদনটিকে একসঙ্গে দেখে। একাডেমিক প্রস্তুতি, কাজের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধিবৃত্তিক ঝোঁক ও সুপারিশের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকাটাই জরুরি। আবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিজের গল্পকে ‘ইমপ্রেসিভ’ বানানো নয়। এত বছরের কাজের মধ্যে একটি সুসংগত যোগসূত্র খুঁজে বের করাই আসল কাজ, বলেন তিনি। অন্যের এসওপি নকল করা বা ‘হার্ভার্ড কী শুনতে চায়’ অনুমান করে কৃত্রিম গল্প বানানোর চেয়ে নিজের কাজ ও উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরাই ভালো বলে মনে করেন তিনি।

নতুনদের জন্য পরামর্শ

নতুনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের ওয়েবসাইট খুলেই ভাবে, এটি আমার জন্য নয়।’ শুধু একটি ‘পারফেক্ট প্রোফাইল’ বানানোর পেছনে না ছুটে নিজের ভাবনা, কাজ, ব্যর্থতা ও শেখার মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি সুপারিশপত্র, ট্রান্সক্রিপ্ট, ইংরেজি পরীক্ষা, রচনা ও ফান্ডিংয়ের খোঁজ শেষ মুহূর্তে না রেখে আগে থেকেই শুরু করার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে বৃত্তির খোঁজ ভর্তির আবেদনের পরে নয়, আগেই শুরু করা উচিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডিংয়ের পাশাপাশি বাইরের স্কলারশিপের সময়সীমাও খেয়াল রাখতে হবে বলে জানান তিনি।

আগামীর স্বপ্ন

ভবিষ্যতে সায়মা গ্রামের মেয়ে, বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা মেয়ে, রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীসহ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা, প্রযুক্তি ও লার্নিং ডিজাইন কাজে লাগিয়ে কার্যকর মডেল গড়তে চান। হার্ভার্ডে অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকেন্দ্রিক প্রমাণভিত্তিক ও টেকসই উদ্যোগ গড়াই তাঁর লক্ষ্য।