কক্সবাজারের মেয়ে নীলা ওয়ান রাখাইন। বেড়ে উঠেছেন মধ্যবিত্ত পরিবারে। স্নাতক পড়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে। শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডির প্রস্তাব পেয়েছেন। নানা প্রতিকূলতা জয় করে ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নিয়েছেন পূর্ণ বৃত্তি হিসেবে। সেখানে তিনি টিচিং অ্যান্ড লার্নিং বিষয়ে পিএইচডি করবেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম।
নীলার জন্ম কক্সবাজারের খুরুশকুল গ্রামের এক মধ্যবিত্ত রাখাইন পরিবারে। তাঁর দুই বছর বয়সে পরিবারটি চলে আসে কক্সবাজার সদরে। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। তাঁর বাবা মংফ্রুথেন রাখাইন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি পেশায় দরজি। ছোটবেলা থেকে নীলার স্বপ্ন শিক্ষক হওয়ার।
স্কুলজীবনে আন্তরিকতার সঙ্গে পড়ানোর জন্য শিক্ষক কম পেয়েছেন তিনি। সেখান থেকে ঠিক করেছিলেন, কখনো এমন শিক্ষক হবেন না, যিনি প্রশ্ন করলে বিরক্ত হন। এখনো কাউকে পড়ালে ভয় না দেখিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
বাবা একা উপার্জনে সংসার ভালোভাবে চলত না। ফলে ভালো টিউশন বা ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগও পাননি নীলা।
তবে পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় বার্মিজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন নীলা।
পড়াশোনার সময় নীলা টিউশন করাতেন। পড়াতে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত থাকতে ভালো লাগত তাঁর। আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং করার সুযোগ হয়নি। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে কাজ করতেন। সেখানে মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা পেতেন। জমানো সেই টাকা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে কাজে লাগে।
হন টেন মিনিট স্কুলের সঙ্গে। সেখানে শিক্ষাবিষয়ক ভিডিও তৈরি করতেন। নিজের পেজেও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হওয়ার বিভিন্ন ভিডিও শেয়ার করতেন। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের অনলাইনেও পড়িয়েছেন। কয়েকটি সংগঠনেও যুক্ত ছিলেন।
তখন থেকে নিজের স্কিল প্রোফাইল সমৃদ্ধের চেষ্টা করছিলেন নীলা। চট্টগ্রামের একটি হাইস্কুলেও শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি ‘সালো একাডেমি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এখানে রাখাইন শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা ও ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রেজেন্টেশন, কমিউনিকেশন ও লিডারশিপের মতো দক্ষতাও শেখানো হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩.৪৫ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করেন নীলা। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যাপকেরা ছিলেন ডক্টরেট। তাঁদের সমৃদ্ধ প্রোফাইল ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন তাঁকে অনুপ্রাণিত করত। শেখার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। তাই ধাপে ধাপে আরও ভালো প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। স্নাতকের পর ভর্তি হন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের মাস্টার্স প্রোগ্রামে। সেখানে ৩.৫২ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
সেখানকার শিক্ষকেরা তাঁকে বিদেশে পড়াশোনার গুরুত্ব নিয়ে নিয়মিত উৎসাহ দিতেন। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই পিএইচডি করার আগ্রহ তৈরি হয়।
পিএইচডির আবেদনের প্রস্তুতিও সহজ ছিল না নীলার জন্য। তখন তিনি ইউনিসেফে শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে চাকরি করতেন। অফিসেই বেশির ভাগ সময় প্রস্তুতি নিতেন। আইইএলটিএস পরীক্ষার পর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক বাছাইয়ের কাজ। কোন অধ্যাপক কোন বিষয়ে গবেষণা করছেন, তা বিস্তারিত পড়তেন। সব তথ্য আলাদা একটি শিটে গুছিয়ে রাখতেন। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন নীলা। প্রথম দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরপর প্রত্যাখ্যাত হন। তবে স্বামীর সমর্থন ছিল। এরপর বাকি তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডির অফার আসে। ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং এবং ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে কারিকুলাম অ্যান্ড ইনস্ট্রাকশন বিষয়ে পূর্ণ বৃত্তিসহ পিএইচডির সুযোগ পান। এ ছাড়া কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতেও পিএইচডির সুযোগ মেলে। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে ইন্টারভিউ দিতে হয়। একটি ছিল ভিডিও ইন্টারভিউ, অন্যটি লাইভ। ইন্টারভিউতে শিক্ষকেরা আন্তরিক ছিলেন। ফলে তাঁর ভয় কেটে যায়। ক্লেমসন ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপকের গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে নীলার নিজের আগ্রহ মিলে যায়। ওই অধ্যাপক তাঁর প্রোফাইল পছন্দ করে ফান্ডের ব্যবস্থা করেন। এরপর আসে অফার লেটার। পুরোপুরি ফান্ডেড হওয়ায় তাঁকে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে হয়নি। ফলে ভিসাও সহজে পেয়ে যান।
বৃত্তি পাওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলে জানান নীলা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ফান্ডিং সংকট চলছে। ভালো শিক্ষার্থী না হলে এমন পরিস্থিতিতে ফান্ড পাওয়া সহজ নয়। তাই ফুল ফান্ডেড অফার পেয়ে তিনি একই সঙ্গে অবাক ও আনন্দিত হয়েছেন।
নীলা টিচিং অ্যান্ড লার্নিং বিষয়ে পিএইচডি করবেন। প্রোগ্রামে আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেশন, রিসার্চ মেথড, টিচার এডুকেশনসহ বিভিন্ন কোর্স থাকবে। এই বৃত্তির আওতায় রয়েছে টিউশন ফি, স্বাস্থ্যবিমাসহ বিভিন্ন সুবিধা। ভালো ফান্ডিং পাওয়ায় তাঁর স্বামীও তাঁর সঙ্গে যেতে পারছেন।
যাঁরা বিদেশে পড়তে চান, তাঁদের শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নীলা। ইচ্ছা থাকলে একেবারে শুরু থেকে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। নিজে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে বিভিন্ন সংগঠন ও এক্সট্রা কারিকুলার কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
এসব তাঁর প্রোফাইল ও সিভি অনেক সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি গবেষণার অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি।
মাস্টার্সে থিসিস করা, বইয়ের চ্যাপ্টার লেখা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর কাজে এসেছে। নতুনেরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসব কাজ শুরু করতে পারেন। শুধু ভালো নম্বরের পেছনে না ছুটে নেত্বত্ব ও উপস্থাপনার মতো দক্ষতা অর্জন এবং সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মেয়েদের নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে লক্ষ্য স্থির করে শিক্ষার জন্য এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন নীলা।