ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় চূড়ান্ত ব্যবধান অনেক সময় তৈরি করে লিখিত অংশ। তাই এটিকে কখনোই শেষ মুহূর্তের জন্য ফেলে রাখা উচিত নয়। মূল বিষয় পড়ার সময় লিখিত প্রশ্নের উত্তর লেখার অভ্যাস করতে হবে। একটি প্রশ্নের উত্তর জানা আর সেটি পরীক্ষার খাতায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা—দুটি আলাদা দক্ষতা। তাই নিয়মিত লিখে অনুশীলন করতে হবে। উত্তর কতটুকু লিখতে হবে, কোন তথ্য আগে দিতে হবে, কীভাবে সময়ের মধ্যে উত্তর শেষ করতে হবে—এসব বিষয়ে অভ্যাস তৈরি জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইউনিটে ভালো করতে হলে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি স্মার্ট কৌশলও প্রয়োজন। প্রস্তুতির শুরুতে উচ্চমাধ্যমিকের মূল বিষয়গুলোর ভিত্তি শক্ত করতে হবে। শুধু গাইড বা প্রশ্নব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে মূল বই ভালোভাবে পড়তে হবে। বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে পরীক্ষার ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা চাই। কোন অধ্যায় থেকে কী ধরনের প্রশ্ন আসে, কোন টপিকে বারবার ভুল হচ্ছে—এসব আলাদা করে চিহ্নিত করা জরুরি। ভুল প্রশ্নের জন্য আলাদা নোট তৈরি করে নিয়মিত রিভিশন দিলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা কমে।
পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই দুই বিষয়ে ভালো করতে উচ্চমাধ্যমিকের মূল বইয়ের পাশাপাশি মানসম্মত সহায়ক বই থেকে পর্যাপ্ত অনুশীলন করতে হবে। বিশেষ করে সেরা বিষয়গুলোতে সুযোগ পেতে বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নব্যাংক এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক সমাধান করা যেতে পারে। রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও শুধু মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। প্রতিটি বিষয় বুঝে পড়তে হবে। কোনো তথ্যের সঙ্গে অন্য তথ্যের সম্পর্ক থাকলে সেটি বুঝে নিলে রিভিশনের সময়ও সহজ হয় এবং প্রয়োগভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ে।
বিজ্ঞান বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী লিখিত অংশে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। এর অন্যতম কারণ হলো সময়ের সঠিক ব্যবহার না করা। কেউ একটি প্রশ্নে অতিরিক্ত সময় দিয়ে ফেলেন, কেউ আবার নম্বর অনুযায়ী উত্তর না লিখে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি সময় ব্যয় করেন। এ কারণে শুরু থেকে লিখিত অংশের অনুশীলন করা জরুরি। নির্দিষ্ট সময় ধরে পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। কোন প্রশ্ন আগে উত্তর করবেন, কোন প্রশ্নে কত সময় দেবেন এবং কোনো প্রশ্নে আটকে গেলে কখন সেটি ছেড়ে এগিয়ে যাবেন—এসব কৌশল নিয়মিত মডেল টেস্টের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হবে।
ভর্তি পরীক্ষার শেষ সময়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো নতুন নতুন বই ও বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া। এতে আগে পড়া বিষয়ও অনেক সময় ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শেষ সময়ে নতুন কিছু শুরু করার পরিবর্তে আগে পড়া বিষয়গুলো বারবার রিভিশন দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের দুর্বল অধ্যায়গুলো আলাদা চিহ্নিত করতে হবে। যে প্রশ্নগুলোতে বারবার ভুল হচ্ছে, সেগুলো আবার সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি বিগত বছরের প্রশ্ন ও মডেল টেস্ট নিয়মিত দিতে হবে। এতে শুধু প্রস্তুতি যাচাই হবে না, পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক চাপ সামলানোর অভ্যাসও তৈরি হবে।
প্রস্তুতির পাশাপাশি পরীক্ষার হলে মাথা ঠান্ডা রাখার মানসিক অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে। প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিটে অচেনা বা কঠিন প্রশ্ন দেখে প্যানিক করলে পুরো পরীক্ষায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই কোনো প্রশ্ন কঠিন মনে হলে হতাশ না হয়ে সহজ প্রশ্নগুলো আগে উত্তর করা ভালো। ওএমআর শিট পূরণের সময় বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর লেখার পর তা বারবার যাচাই করে নিতে হবে। প্রতিটি বৃত্ত খুব সাবধানে পূরণ করতে হবে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একটি ছোট ভুল যেন পুরো পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব না ফেলে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিঃসন্দেহে কঠিন প্রতিযোগিতাগুলোর একটি। তবে কঠিন মানেই অসম্ভব নয়। শেষ সময়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। এত দিনের প্রস্তুতির ওপর আস্থা রেখে দুর্বল জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে এবং নিজের সময় সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে, সফলতার জন্য শুধু দীর্ঘ সময় পড়লেই হবে না; প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, বিস্তৃত ধারণা, নিয়মিত রিভিশন, প্রশ্ন অনুশীলন, সময় ব্যবস্থাপনা এবং পরীক্ষার হলে স্থির থাকার ক্ষমতা। শেষ মুহূর্তে কত ঘণ্টা পড়েছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কতটা শিখেছেন, কতটা মনে রাখতে পেরেছেন এবং পরীক্ষার হলে কতটা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন। তাই হতাশা ভুলে নতুন উদ্যমে শেষ সময়টুকু কাজে লাগান। নিজের প্রস্তুতির ওপর বিশ্বাস রাখুন, ভুলগুলো শুধরে নিন এবং প্রতিটি দিন কাজে লাগান। সঠিক আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পিত প্রস্তুতি আর নিয়মিত অনুশীলনই হয়তো পৌঁছে দেবে আপনার স্বপ্নের ক্যাম্পাসে।
লেখক: লিমা আক্তার, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়