বিদেশে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবলে অনেক শিক্ষার্থীর চোখের সামনে প্রথমে আসে কয়েকটি পরিচিত বিষয়। ইংরেজি ভাষার পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় খোঁজা, স্কলারশিপ দেখা এবং অনলাইনে আবেদন করা। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি শক্তিশালী আবেদন তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয় তারও আগে। অনলাইন ফরম কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনে পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু নিজের লক্ষ্য, একাডেমিক প্রস্তুতি, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গড়ে ওঠে সময় নিয়ে। তাই বিদেশে উচ্চশিক্ষাকে শুধু আবেদন করার কাজ হিসেবে না দেখে, নিজের পরবর্তী একাডেমিক ও পেশাগত যাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে দেখাই বেশি কার্যকর।
প্রস্তুতির শুরুতে নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা দরকার। আমি কেন বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চাই? কোন বিষয়ে পড়তে চাই? এই পড়াশোনা আমার আগের শিক্ষা, কাজ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত? আমি কী ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা বা গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই?
এই উত্তরগুলো শুরুতে চূড়ান্ত হতে হবে না। সময়ের সঙ্গে এগুলো বদলাতে পারে। তবে একটি প্রাথমিক দিকনির্দেশনা থাকলে দেশ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রোগ্রাম ও অর্থায়নের সুযোগ খোঁজা অনেক বেশি অর্থবহ হয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্য কারও পথ অনুসরণ করা নয়। বরং নিজের শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপটি কোথায় হতে পারে, তা বুঝে নেওয়া।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা একই পরিবেশ থেকে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন না। কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, কেউ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে। আবার কারও শিক্ষাজীবনের একটি অংশ মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায়। কেউ ঢাকায় থেকে নানা সেমিনার, পরামর্শ ও তথ্যের সুযোগ পান। আবার কেউ জেলা বা গ্রাম থেকে নিজের উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করেন। এই পার্থক্যের অর্থ হলো, প্রস্তুতির ধরনও সবার জন্য এক হবে না। কারও ভালো একাডেমিক নেটওয়ার্ক আছে, কিন্তু অর্থায়ন প্রয়োজন। কারও আর্থিক সহায়তা আছে, কিন্তু কোন প্রোগ্রাম উপযুক্ত, তা পরিষ্কার নয়। কেউ ইংরেজি ও একাডেমিক লেখায় স্বচ্ছন্দ। আবার কারও এসব দক্ষতা ধীরে ধীরে গড়ে তোলার প্রয়োজন হতে পারে।
তাই তুলনার চেয়ে নিজের বর্তমান অবস্থান বোঝা বেশি জরুরি। আপনি কোথা থেকে শুরু করছেন, আপনার হাতে কী সুযোগ আছে এবং আগামী এক বছরে কোন জায়গাগুলোতে নিজেকে আরও প্রস্তুত করতে পারেন; সেই হিসাবটাই কার্যকর।
ভালো সিজিপিএ অবশ্যই মূল্যবান। তবে একটি আবেদন সাধারণত শুধু ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কলারশিপে বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি, গবেষণা বা প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, লেখার দক্ষতা, পেশাগত কাজ, নেতৃত্ব, স্বেচ্ছাসেবী সম্পৃক্ততা কিংবা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক অর্জনও বিবেচনায় আসতে পারে।
এখানে সবার পথ এক হওয়া প্রয়োজন নেই। স্নাতকের একজন শিক্ষার্থীর জন্য ক্লাসের বাইরের পড়াশোনা, ছোট কোনো প্রকল্প বা গবেষণার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আগের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ বিশেষায়ণের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট করা দরকার হতে পারে। পিএইচডির কথা ভাবলে গবেষণার দিকনির্দেশনা ও পূর্ববর্তী কাজের গুরুত্ব বাড়ে। মূল প্রশ্ন হলো, যে ডিগ্রির জন্য আবেদন করবেন, তার জন্য আজ থেকে কীভাবে নিজেকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা যায়।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। তবে ভাষার পরীক্ষার স্কোরের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য আরও কিছু একাডেমিক দক্ষতা দরকার।
গবেষণাপত্র পড়া, নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ করা, উৎস ব্যবহার করা, উপস্থাপনা দেওয়া এবং আলোচনায় অংশ নেওয়ার অভ্যাস সময়ের সঙ্গে তৈরি হয়।
যাঁদের শিক্ষাজীবনে ইংরেজি ব্যবহারের সুযোগ তুলনামূলক কম ছিল, তাঁদের জন্য এই প্রস্তুতি একটু আগে শুরু করা উপকারী। বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের আলাদা করে দেখার নয়। বরং যে দক্ষতা যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সময় দিয়ে তা গড়ে তোলাই জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং বা পরিচিতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে একটি প্রোগ্রাম আপনার বিষয়, লক্ষ্য, আর্থিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা মানানসই, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই বিষয়ের প্রোগ্রাম দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলেও তাদের কোর্স, গবেষণার ক্ষেত্র, শিক্ষক, ভর্তি-শর্ত ও অর্থায়নের সুযোগ আলাদা হতে পারে। তাই ‘কোন বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে ভালো?’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘আমার বর্তমান প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য কোন প্রোগ্রামটি সবচেয়ে উপযুক্ত?’—এই প্রশ্নও রাখা দরকার। গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রির ক্ষেত্রে এই উপযুক্ততা আরও গুরুত্বপূর্ণ। সুপারভাইজার বাছাই, যোগাযোগ বা আবেদনপত্রের নির্দিষ্ট অংশগুলো অবশ্য আলাদা প্রস্তুতির বিষয়। সেগুলো নিয়ে পরবর্তী ধাপে বিস্তারিতভাবে ভাবা যায়।
যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থায়ন স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুরু থেকে এমন প্রোগ্রাম ও দেশের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে, যেখানে স্কলারশিপ, টিউশন সহায়তা, গবেষণা অর্থায়ন বা অন্য ধরনের সহায়তার সুযোগ আছে।
একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, উচ্চশিক্ষার অনেক প্রাথমিক প্রস্তুতিই বিনা খরচে বা খুব কম খরচে শুরু করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট পড়া, প্রোগ্রাম তুলনা করা, নিজের বিষয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণের জন্য অর্থের চেয়ে নিয়মিত সময় ও মনোযোগ বেশি প্রয়োজন।
পরিবারের সঙ্গেও শুরু থেকে সম্ভাব্য খরচ, সময় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
ঢাকায় থাকা শিক্ষার্থীরা অনেক সময় বেশি সেমিনার, শিক্ষা মেলা বা পরামর্শের সুযোগ পান। অন্যদিকে জেলা বা গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনেক তথ্য অনলাইনে খুঁজতে হয়। কিন্তু অবস্থান একমাত্র নির্ধারক নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরামর্শ সহায়ক হতে পারে। তবে ভর্তি, স্কলারশিপ, ভাষার যোগ্যতা বা প্রয়োজনীয় নথিপত্রের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল তথ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
এর একটিমাত্র উত্তর নেই। আপনি অনার্সের প্রথম বর্ষে, শেষ বর্ষে, মাস্টার্সে, চাকরিতে কিংবা গবেষণায় রত থাকতে পারেন; প্রত্যেক অবস্থার প্রস্তুতি আলাদা। স্নাতকের শুরুতে নিজের বিষয়টি ভালোভাবে শেখা, পড়ার অভ্যাস ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া যায়। শেষ বর্ষে দেশ, প্রোগ্রাম ও অর্থায়নের সুযোগ সম্পর্কে আরও নির্দিষ্টভাবে খোঁজ করা যায়। মাস্টার্স পর্যায়ে বিশেষায়ণ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্পষ্ট করা যায়। আর পিএইচডির কথা ভাবলে গবেষণার দিকনির্দেশনা ও সম্ভাব্য গবেষণা-পরিবেশ নিয়ে আগে থেকে চিন্তা করা প্রয়োজন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট তারিখে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় তখনই, যখন একজন শিক্ষার্থী নিজের পরবর্তী ধাপ নিয়ে সচেতনভাবে ভাবতে শুরু করেন। একটি আবেদনপত্র হয়তো এক বিকেলে পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু সেই আবেদনপত্রে যে একাডেমিক যাত্রা, প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রতিফলিত হবে, তা সময় নিয়ে গড়ে ওঠে। তাই প্রথম কাজ ফরম খোঁজা নয়। প্রথম কাজ নিজের অবস্থান বোঝা, লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং ধীরে ধীরে একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তুতির পথ তৈরি করা।
লেখক: পিএইচডি গবেষক ও শিক্ষক দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া