সংগীত শুধু বিনোদন নয়, বরং মানুষের প্রাণের প্রশান্তির শ্রেষ্ঠ অনুষঙ্গ। অনাদিকাল থেকে চলে আসা এই চর্চা মানুষের চিত্তপিপাসা নিবারণের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। একটি রুচিশীল ও প্রগতিশীল জাতি গঠনে সংগীতশিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম।
প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দ ও সুর থেকে সংগীতের জন্ম। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে সিন্ধু অববাহিকায় এই উপমহাদেশে সংগীতের আদি রূপের সন্ধান মেলে। পরে বিশ্বজুড়ে মোৎসার্ট, বিটোফেন থেকে শুরু করে লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো মহান সাধকেরা সংগীতের মাধ্যমে নতুন চেতনার জন্ম দেন।
প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন নয়। ১৭১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে প্রথম সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৩২ সালে ‘বোস্টন একাডেমি অব মিউজিক’ গঠিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ভবন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। বাংলাদেশে ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ খোলার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় এর সূচনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংগীত কলা অনুষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। এখানে সংগীতের উদ্ভব, লোকসংগীত, বাংলা গানের বিবর্তন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীতের ইতিহাস এবং দেশ-বিদেশের মহান সংগীতসাধকদের জীবনদর্শন পড়ানো হয়। এ ছাড়া ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরি, কীর্তন, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, শ্যামাসংগীত, ইসলামী গান ও স্বদেশপ্রেমের গানের মতো বিচিত্র ধারা নিয়ে বিশদ চর্চা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাদন, কণ্ঠসাধনা এবং আধুনিক শব্দ প্রকৌশলের ব্যবহারিক জ্ঞানও দেওয়া হয়।
কারা পড়বেন এবং কোথায় সুযোগ রয়েছে যাঁরা গানকে ভালোবেসে সুরের অন্তরালে মিশে যেতে চান এবং নিজেকে সংস্কৃতি অঙ্গনের একজন সুযোগ্য শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তাঁদের জন্য এটি পছন্দের বিষয় হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ রয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি ও ডিগ্রি সংগীত কলেজেও উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিশ্বভারতী, রবীন্দ্রভারতী, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়সহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জার্মানি, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে আইসিসিআর এবং সরকারি বৃত্তির মাধ্যমে উচ্চতর গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
সংগীতে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসের সাধারণ ও নন-ক্যাডার পদে, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং সাংস্কৃতিক সংস্থায় পেশা হিসেবে যুক্ত হতে পারেন। বাংলাদেশ বেতার, বিটিভি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ডিগ্রিধারীদের কাজের সুযোগ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগও রয়েছে।
মানসিক প্রশান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে সংগীতের ভূমিকা অতুলনীয়। বর্তমান সমাজে সহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মৌলবাদমুক্ত প্রগতিশীল ধারা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংগীতচর্চা অনন্য ভূমিকা পালন করে।
লেখক: ড. দেবাশীষ বেপারী, সহযোগী অধ্যাপক, সংগীত বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়