দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিবছর সনদ হাতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হন। কিন্তু চাকরির বাজারে ঢুকতে গিয়ে অনেকে হোঁচট খান, এক বাস্তবতায়, যা পাঠ্যবই থেকে শেখানো হয় না। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাগত সাফল্যের মাত্র ১৫ শতাংশ নির্ভর করে কারিগরি দক্ষতা বা হার্ড স্কিলের ওপর।
বাকি ৮৫ শতাংশ নির্ধারিত হয় যোগাযোগ দক্ষতা, সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা এবং চাপের মধ্যে স্থির থাকার মতো সফট স্কিল দিয়ে। আজকের আলোচনা সেই না-শেখানো দক্ষতা নিয়ে। লিখেছেন ক্যারিয়ার উন্নয়নবিষয়ক লেখক ও প্রযুক্তিবিদ ড. মশিউর রহমান।
চলুন, একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। রাফি ও তামিম—দুজন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক। রাফির সিজিপিএ ৩.৮, তামিমের ৩.১। স্নাতক শেষে তাঁরা একই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। নির্বাচিত হন তামিম; রাফিকে ফিরতে হয় খালি হাতে। ঘটনাটি অনেককে অবাক করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো শিক্ষাজীবনের ফল আর কর্মক্ষেত্রের চাহিদা এক নয়। তাই শুধু কারিগরি জ্ঞানার্জন বা সিজিপিএর পেছনে ছুটলেই হবে না; নিয়োগকর্তার প্রত্যাশা বোঝাও সমান জরুরি।
চাকরির ‘প্রবেশপত্র’
এই দক্ষতা হলো এমন দক্ষতা, যা শেখানো যায়, মাপা যায় এবং পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যায়। যেমন প্রোগ্রামিং, হিসাববিজ্ঞান বা ভাষাজ্ঞান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো পাঠ্যক্রম মূলত এই দক্ষতা তৈরিকে কেন্দ্র করে নকশা করা। পরীক্ষা নেওয়া হয় এর ভিত্তিতে, সিজিপিএও এর ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তবে এটি মূলত চাকরির ‘প্রবেশপত্র’ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, এর বেশি নয়।
চাকরি পেতে এগিয়ে রাখে
অন্যদিকে সফট স্কিল হলো মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা। কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়, চাপের মধ্যে কীভাবে স্থির থাকতে হয়, দলের সঙ্গে কীভাবে মিলেমিশে এগোতে হয়, সমস্যার মুখে কীভাবে সৃজনশীলভাবে সাড়া দিতে হয়। এগুলোই সফট স্কিল। এসব দক্ষতা কোনো পাঠ্যবইয়ে নেই। তবে কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মূল্য পায়। লিংকডইনের এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৯২ শতাংশ নিয়োগকর্তা মনে করেন, সফট স্কিল হার্ড স্কিলের সমান গুরুত্বপূর্ণ, বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। কারণ, কর্মক্ষেত্রে শুধু কাজ জানাই যথেষ্ট নয়—মানুষকে বুঝে কাজ করাও জরুরি।
সাক্ষাৎকারে আসল পরীক্ষা
চাকরির সাক্ষাৎকারে কারিগরি প্রশ্ন থাকলেও অধিকাংশ প্রশ্নই আচরণ ও মানসিকতা যাচাইয়ের জন্য করা হয়। যেমন ‘দলে দ্বন্দ্ব হলে কীভাবে সামলেছেন?’ ‘চাপের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে কী করেন?; এসব প্রশ্নের উত্তর বইয়ে পাওয়া যায় না। এখানে যাচাই করা হয়, প্রার্থী সংকটে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন, ভুল স্বীকার করতে পারেন কি না এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে নিজেকে কতটা সামলে রাখতে পারেন। রাফি কারিগরি প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিলেও নিজের ভুলের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নে থমকে যান। অন্যদিকে তামিম কম দক্ষতা নিয়েও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এই পার্থক্যই শেষ পর্যন্ত নিয়োগের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।
কেন সফট স্কিল জরুরি
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থী একা পরীক্ষা দেন, একা ফল পান। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কাজ হয় দলগতভাবে। সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা হলে কাজ আটকে যায়, মতামত স্পষ্ট না হলে সিদ্ধান্ত দুর্বল হয়, আর চাপ সামলাতে না পারলে পুরো দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হার্ড স্কিল শেখায়, কীভাবে কাজ করতে হয়। সফট স্কিল শেখায়, মানুষকে নিয়ে কীভাবে কাজ করতে হয়।
কীভাবে বাড়ানো যায়
মনে রাখতে হবে, সফট স্কিল জন্মগত নয়। এটি চর্চার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবী কাজ, ইন্টার্নশিপ—এসব অভিজ্ঞতা নিয়মিত অংশ নিলে এই দক্ষতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করতে পারাটাই এগিয়ে যাওয়ার পাথেয়।
সিজিপিএ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি শুধু চাকরির দরজায় পৌঁছে দেয়। চাকরি পাওয়া,টিকে থাকা এবং এগিয়ে যাওয়া—সবকিছু নির্ভর করে আচরণ, আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা ও মানসিক দৃঢ়তার ওপর। রাফির গল্প এখানেই শেষ নয়। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে সে প্রস্তুতি বদলায় এবং পরবর্তী সাক্ষাৎকারে সফল হয়। সময়টা নষ্ট হয়েছিল, এটাই শিক্ষা। এই ভুল যেন আর কারও জীবনে না ঘটে, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।