বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলে স্নাতক (সম্মান) শিক্ষার্থীদের ১ হাজার ২০০ টাকা এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, অসুস্থতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে পরীক্ষা মিস করলেও এ পরিমাণ জরিমানা দেওয়া সাধারণ, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য কষ্টসাধ্য।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যসচিব ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ক্যাম্পাসে এ নিয়ে সমালোচনা ও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, অসুস্থতাজনিত কারণে মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ১ হাজার ২০০ টাকা এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে। নির্ধারিত ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার পর এ নিয়ম কার্যকর হবে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও মিড উইকের নিয়ম থাকলেও বিভিন্ন বিভাগে তা সব সময় অনুসরণ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা নিজেদের মতো করে পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করেন। ফলে বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা মিস করার ঘটনা ঘটে। পরীক্ষার সময়সূচি যথাযথভাবে না জানিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর জুলুমের শামিল বলেও মন্তব্য করেছেন তাঁরা।
বেরোবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন ইসলাম বলেন, ‘অনেক বিভাগে মিড উইক নেই। শিক্ষকেরা নিজেদের মতো করে পরীক্ষা নেন। তাঁদের ইচ্ছামতো পরীক্ষা নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা মিস করলে জরিমানা করা অযৌক্তিক এবং একধরনের জুলুম।’ তিনি বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। তাঁরা নানা সমস্যার মধ্যে পড়াশোনা করেন। আমরা চাই, এ ধরনের জরিমানা ব্যবস্থা না থাকুক। মিড উইক থাকবে এবং সেই অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হবে না।’
ইয়ামিন ইসলাম আরও বলেন, ‘এখানে শিক্ষকেরাই অনিয়ম করছেন। সে ক্ষেত্রে আমরা চাই, সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও গঠনতান্ত্রিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হোক।’
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান সিয়াম বলেন, ‘প্রশাসন কি একবারও ভেবে দেখেছে, এই টাকাটা কারও এক মাসের সিট ভাড়া, আবার কারও ১৫ দিনের খাবার খরচ। এসব বাস্তবতা যদি একটু বোঝা হতো, তাহলে শিক্ষার্থীদের ওপর বোঝা চাপায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে হয়তো আরেকবার ভাবা হতো।’ তিনি বলেন, ‘আমি তো হঠাৎ করে অসুস্থ হতেই পারি। অসুস্থতার কারণে যদি কোনো পরীক্ষা দিতে না পারি, সে জন্যও আবার ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে। বিষয়টি সত্যিই হতাশাজনক। শিক্ষার্থীদের সমস্যা বোঝার কথা যাঁদের, তাঁরাই যদি এমন সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আমরা যাব কোথায়।’
রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সব শ্রেণির শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। অসুস্থতা বা বিভিন্ন কারণে কোনো শিক্ষার্থী মিড পরীক্ষা দিতে না পারলে শিক্ষক বা বিভাগের পরামর্শে তাঁকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেত। প্রশাসনের এ ব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য জরিমানা দেওয়া খুবই কষ্টকর হবে। আমি মনে করি, প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীবান্ধব নয়, যদিও প্রশাসন সব সময় বলে তারা শিক্ষার্থীবান্ধব।’
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি তখনই কার্যকর হওয়া উচিত, যখন একজন শিক্ষার্থী সেমিস্টারের শুরুতেই জানতে পারবেন তাঁর পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি বিভাগের একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার থাকা উচিত, যেখানে ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমের সময়সূচি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। অন্যথায়, পরীক্ষার সময়সূচি না জানিয়ে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর জুলুম করার শামিল।’
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা মিস করার প্রবণতা কমাতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যসচিব ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘জরিমানা করাটা আসলে মুখ্য বিষয় নয়। অকারণে বা ভিত্তিহীন অজুহাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিড সেমিস্টার পরীক্ষা মিস করার প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যে হারে মিড সেমিস্টার পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে, সেই তুলনায় ফাইনাল পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে না। আমরা মনে করি, এই নিয়ম আরোপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কমবে।’