চারুকলায় ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থীর শিল্পী হওয়ার স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম, নম্বর বণ্টন ও ধাপে কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রস্তুতির মৌলিক বিষয়গুলো প্রায় একই।
চারুকলায় মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে ভালো করা যায় না। প্রয়োজন পর্যবেক্ষণশক্তি, অনুধাবন ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা, আঁকার মৌলিক দক্ষতা এবং নির্দিষ্ট সময়ে নিজের ভাবনা কাগজে প্রকাশ করার সক্ষমতা। তাই প্রস্তুতির শুরুতে নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে।
রেখা, আকৃতি, অনুপাত, আলো-ছায়া, ফর্ম, গঠন, পারস্পেকটিভ ও কম্পোজিশন; চারুকলার প্রস্তুতিতে এসব মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিদিন বিভিন্ন বস্তু, মানুষ, গাছপালা, স্থাপনা ও দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য দেখে স্কেচ করার অভ্যাস করতে হবে। একটি সুন্দর ছবি আঁকার চেয়ে কোনো বিষয় সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে তার গঠন, অনুপাত ও বৈশিষ্ট্য কাগজে তুলে ধরতে পারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে লাইভ ফিগার বা মানুষের অবয়ব আঁকার অনুশীলন পর্যবেক্ষণ ও হাতের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সাহায্য করে।
চারুকলায় নির্দিষ্ট বিষয় নিজের চিন্তা, কল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে উপস্থাপনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হয়। তাই শুধু অনুকরণ না করে একই বিষয়কে বিভিন্নভাবে কল্পনা ও উপস্থাপনের চর্চা করা জরুরি। চারপাশের সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষ ও দৈনন্দিন জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সৃজনশীলতা বাড়ে এবং পরীক্ষার্থীর শিল্পীসত্তা বিকশিত হয়।
চারুকলার পরীক্ষায় অঙ্কন দক্ষতার পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে অনুশীলনের সময় ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্কেচ বা কম্পোজিশন শেষ করার অভ্যাস করতে হবে। এতে পরীক্ষার হলে সময়ের চাপ সামলে কাজ শেষ করা সহজ হবে। অতিরিক্ত সময় ব্যয় বা তাড়াহুড়া করা—দুটিই এড়িয়ে চলতে হবে। কোন অংশে কতটা সময় দিতে হবে, তা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হবে।
রাবির চারুকলা ইউনিটের প্রস্তুতির জন্য ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট মানবিক ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে পাস মার্ক ৪০ নম্বর অর্জনকারী পরীক্ষার্থীরা পরবর্তী ধাপে চারুকলার ব্যবহারিক বা অঙ্কন পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। রাবির চারুকলা অনুষদে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। তিনটি বিভাগে আটটি ডিসিপ্লিনে এসব আসন বণ্টিত। গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগে তিনটি ডিসিপ্লিনে ১৫টি করে মোট ৪৫টি আসন রয়েছে। চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগে তিনটি ডিসিপ্লিনে ১৫টি করে মোট ৪৫টি আসন। মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগে দুটি ডিসিপ্লিনে ১৫টি করে মোট ৩০টি আসন রয়েছে। পরীক্ষার আগের কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতির বদলে ধারাবাহিক অনুশীলন বেশি কার্যকর। তবে ভর্তি পরীক্ষার যোগ্যতা, নম্বর, ব্যবহারিক পরীক্ষার নিয়ম, আসন বণ্টন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রতিবছর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই রাবিসহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবর্ষের সর্বশেষ ভর্তি বিজ্ঞপ্তিকে চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে অনুসরণ করতে হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষাকে সামনে রেখে নিয়মিত স্কেচ, ফিগার, কম্পোজিশন, পর্যবেক্ষণভিত্তিক অঙ্কন ও সৃজনশীল কাজের অনুশীলন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়ও কাজে আসবে।
তাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন বা নির্দিষ্ট অঙ্কনের ধরন মুখস্থ করার পরিবর্তে বিস্তৃত প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনুশীলন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার অভ্যাস সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর।
চারুকলা নিয়ে একটি ভুল ধারণা রয়েছে; এ বিষয়ে পড়াশোনা করলে কর্মক্ষেত্র সীমিত। বাস্তবে চারুকলার শিক্ষা সৃজনশীল পেশার বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। গ্রাফিক নকশা, বিজ্ঞাপন, প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অ্যানিমেশন, শিক্ষা, জাদুঘর এবং শিল্প-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চারুকলার দক্ষতা কাজে লাগে।
তবে চারুকলায় পড়ার গুরুত্ব শুধু চাকরির সুযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একজন শিক্ষার্থীকে পর্যবেক্ষণ, চিন্তা, সৌন্দর্য অনুধাবন এবং নিজের বক্তব্য শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করতে শেখায়।
তাই চারুকলা ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি হওয়া উচিত পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক। প্রতিদিনের অনুশীলন, গভীর পর্যবেক্ষণ, সৃজনশীল চিন্তা, মৌলিক অঙ্কন দক্ষতা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার—এই বিষয়গুলোকে প্রস্তুতির কেন্দ্রে রাখতে হবে।
লেখক: চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)