ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছা থেকে হঠাৎ ডাক্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত। তারপর দিন-রাত এক করে প্রস্তুতি। আর ফল? মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ৯১ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে দেশসেরা। বলছি নরসিংদীর বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের খামারের চর গ্রামের সন্তান জাহাঙ্গীর আলম শান্তর কথা। তিনি এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধাতালিকায় প্রথম। আজকের পত্রিকার পডকাস্টে এসে তাঁর সফলতার পেছনের গল্প বলেছেন তিনি। লিখেছেন আব্দুর রাজ্জাক খান।
সম্প্রতি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছেন, সামনে শুরু হচ্ছে ক্লাস—কেমন লাগছে?
উত্তর: সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া। দেশের এত শিক্ষার্থীর মধ্যে থেকে তিনি আমাকে বেছে নিয়েছেন। প্রথম হওয়া পড়াশোনার পাশাপাশি আল্লাহর রহমতেরও ফল।
কখনো ভেবেছিলেন প্রথম হবেন, নাকি এমন জেদ কাজ করেছিল?
উত্তর: পরীক্ষার আগে ভাবিনি যে প্রথম হব। কিন্তু পরীক্ষার পর বিভিন্ন কোচিংয়ের সঙ্গে উত্তর মিলিয়ে দেখলাম, ৯২-৯৩টি সঠিক হতে পারে। বন্ধুদের জানালে তারা বলল, ‘তুই তো প্রথম হয়ে যেতে পারিস’। তখন ভেতরে আশা কাজ করছিল, হয়তো প্রথম হতে পারি।
প্রথম হওয়ার খবর পেয়ে অনুভূতি কেমন ছিল?
উত্তর: ফল প্রকাশের দিন বেলা ২টা থেকে ফল জানার চেষ্টা করছিলাম। বিকেল ৫টায় ওয়েবসাইটে দেখলাম, প্রথমে চোখ পড়ে মেরিট পজিশনে। প্রথম দেখায় কিছুই বুঝতে পারিনি। কী করব এখন! তারপর আবার রিফ্রেশ ও সার্চ করে দেখলাম নিশ্চিত প্রথম। তখন আমার সঙ্গে মামা ও বন্ধুরা ছিল। আমি তাদের বললাম, ‘আমি তো প্রথম হয়েছি।’ এক বন্ধু কান্না শুরু করল, ওর কান্না দেখে আমিও কেঁদে ফেললাম।
আপনার অনুপ্রেরণায় কে ছিলেন? কাকে বেশি পাশে পেয়েছেন?
উত্তর: সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার মা-বাবা। আমি তাঁদের ভালো কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। প্রথমে বলেছিলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব। মা-বাবা কখনো বলেননি, ‘তুই ইঞ্জিনিয়ারি কেন পড়বি, মেডিকেল কেন নয়? পরে যখন বললাম, মেডিকেল আমার জন্য ভালো হবে, তখনো তাঁরা সমর্থন দিয়েছিলেন। এই প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে আমি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি।
আপনি তো একসময় ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলেন, হঠাৎ ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা কেন জাগল?
উত্তর: ছোট থেকে মা-বাবা বলতেন, এমন একটি পেশা বেছে নিতে, যা দিয়ে মানুষের সেবা করা যায়। দেশের ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি অনুযায়ী মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাই আমার জন্য সঠিক মনে হয়েছিল। ডাক্তারেরা সরাসরি মানুষের সেবা করতে পারেন—এ কারণেই ডাক্তারি পেশা বেছে নিয়েছি।
এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘চান্স না পেলে বাড়ি ফিরব না।’ এটি কি আত্মবিশ্বাস ছিল, নাকি ভয় থেকে?
উত্তর: এটি আমার আত্মবিশ্বাস ছিল। সঙ্গে জেদও কাজ ছিল। আমি একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরব না। এটি মূলত জেদ থেকেই।
কখনো মনে হয়েছে, ‘আমি আর পারব না?’ বা কান্না পেয়েছে? তখন কীভাবে নিজেকে সামলাতেন?
উত্তর: সাময়িকভাবে হতো। তবে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। আমার মনে হতো, যদি চেষ্টা করি, সর্বোচ্চ পরিশ্রম করি, তাহলে অবশ্যই পারব।
বন্ধুরা ঘুরতে যেত, আপনার কি ইচ্ছা করত না? তখন কীভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতেন?
উত্তর: এসএসসির আগে গ্রামের বাড়িতেই থাকতাম। কলেজে ওঠার পর শহরে চলে আসি এবং সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ভর্তি হই। তখন আমার বন্ধুরা মূলত গ্রামের বাড়িতেই থাকত, শহরে খুব বেশি বন্ধু ছিল না। তাই ঘোরাঘুরি বা আড্ডা তেমন হতো না। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা সহজ ছিল। শুরু থেকে পড়াশোনায় ফোকাসড ছিলাম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন?
উত্তর: একাডেমিকে অনলাইনে পড়ার জন্য মোবাইল ফোন অবশ্যই ব্যবহার করতে হতো। তবে এইচএসসির শুরুতে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। তাই আমি ফেসবুক আইডি ডিঅ্যাকটিভেট করে রেখেছিলাম এবং সামাজিক মাধ্যমের অ্যাপগুলো মুছে দিয়েছিলাম।
ভর্তি পরীক্ষার দৈনিক রুটিন কেমন ছিল, প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন?
উত্তর: খাওয়া-দাওয়া, নামাজ ও অন্যান্য জরুরি কাজ ব্যতীত বাকি সময় পড়াশোনায় ব্যয় করার চেষ্টা করতাম। দৈনিক গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করতাম। কখনো কখনো এর চেয়ে কম বা বেশি সময়ও পড়াশোনা করা হতো।
ভালো ফলের পেছনে পড়াশোনার কোন পদ্ধতি বা কৌশলটি সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে বলে মনে হয়?
উত্তর: প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে পড়া এবং নিজের ভুলগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা। কোন টপিকগুলো থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে, সেগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করে বেশি বেশি পড়তাম। একই সঙ্গে যেসব জায়গায় ভুল হতো, সেগুলোও নোট করে আবার দেখে নিতাম। ফলে ভুল করা টপিকগুলোর প্রতিও ধীরে ধীরে ভালো ধারণা তৈরি হয়েছে।
আপনি মূল বইয়ের দিকে বেশি জোর দিয়েছেন, নাকি সহায়ক বইয়েরও সহযোগিতা নিয়েছেন? মূল বই কতবার রিভিশন দিয়েছেন?
উত্তর: আমি মূল বইয়ের দিকে বেশি জোর দিয়েছি। তবে মেডিকেল প্রশ্নব্যাংকের সমাধান করার জন্য সহায়ক বই দেখতাম। মূল বই অনেকবার রিভিশন দিয়েছি, যার ফলে বইয়ের বিষয়বস্তু ভালোভাবে আয়ত্তে চলে আসে। নির্দিষ্ট করে বললে, জীববিজ্ঞান বইটি প্রায় ৮ থেকে ১০ বার রিভিশন দিয়েছিলাম।
পরীক্ষার ঠিক আগে শেষ সময়ের প্রস্তুতি কেমন ছিল?
উত্তর: শেষ এক থেকে দুই মাস কীভাবে পড়ব, সে অনুযায়ী আমার একটি নির্দিষ্ট রুটিন ছিল। তবে ভর্তি পরীক্ষার ঠিক এক মাস আগে আমার ডেঙ্গু হয়। ডেঙ্গুর কারণে প্রস্তুতির পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়। ভেবেছিলাম তিনবার রিভিশন দিতে পারব, কিন্তু প্রায় ১০ দিনের বিরতি পড়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। দুইবার রিভিশন দিতে পেরেছিলাম। তৃতীয়বার রিভিশনের সময় কিছু অধ্যায় বাদ থেকে যায়। যেসব টপিকে বেশি ভুল করতাম, সেগুলো আলাদা করে নোট করে রাখতাম এবং শেষ এক সপ্তাহে সেই টপিকগুলোর ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
আপনার ভর্তি পরীক্ষার সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
উত্তর: ভর্তি পরীক্ষার এক মাস আগে যখন আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হই, তখন প্রথমে খুব আতঙ্কিত হয়েছিলাম। প্রায় ১০ দিন অসুস্থ ছিলাম এবং পুরোপুরি সুস্থ হতে ১২ দিন সময় লাগে। ভর্তি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই পরিস্থিতি আমার জন্য খুবই চাপের ছিল। কোচিংয়ে মডেল টেস্টের নম্বরও কমতে শুরু করেছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে নিজেকে সামলানোই আমার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘আমায় দিয়ে হবে না’ বা ‘আমি পারব না’ ভেবে চেষ্টাই করে না—তাদের জন্য আপনি কী বলবেন?
উত্তর: সত্যি বলতে, ভর্তি পরীক্ষা এতটা কঠিন নয়। আমি নিজেও গ্রাম থেকে উঠে এসে প্রথম হয়েছি, তাই সব শিক্ষার্থীর মধ্যেই এই সম্ভাবনা আছে। প্রয়োজন হলো সেই সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার এবং নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখা যে ‘আমি পারব।’ নিজের আত্মবিশ্বাস থাকলে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা মনে হয় না কঠিন।
গ্রাম থেকে শহরে এসে পড়াশোনা করা—কোনো চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়েছিল কী?
উত্তর: এসএসসি পর্যন্ত আমি বাড়িতেই ছিলাম। এরপর ঢাকায় এসে ফার্মগেটের একটি হোস্টেলে উঠি। তখন থেকে আমার স্ট্রাগল শুরু হয়, কারণ জীবনের প্রথমবার বাড়ি ছেড়ে আসা। মা-বাবা নেই, বন্ধু-বান্ধবও নেই, সম্পূর্ণ নতুন একটি শহর, পরিচিত তেমন কেউ নেই। প্রথম দিকে হোস্টেলের খাবার ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া আমার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। যারা হোস্টেলে থাকে, তারা ভালো বোঝে সেই পার্থক্য।
পড়াশোনার ব্যয় কে বহন করেছে? কোনো রকম সংকটের মধ্যে পড়তে হয়েছিল কী?
উত্তর: মা-বাবা আমাকে শুরু থেকে মানসিক ও অর্থিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। যেহেতু আমরা একটি মধ্যবিত্ত পরিবার, কিছু টানাপড়েন তো ছিল, কিন্তু মা-বাবা কখনো এসব বিষয়ে আমাকে জানাতেন না এবং অভাব বুঝতে দেননি। আমি যখন বলতাম, ‘আমার এই বই লাগবে’ বা ‘কোর্সে ভর্তি হতে হবে, ’ তারা কখনো প্রশ্ন করতেন না, ‘এটা কেন লাগবে?’ আমার যা যা প্রয়োজন হতো, সবই তারা সবসময় সরবরাহ করত।
যদি মেডিকেলে সুযোগ না পেতেন, তাহলে কী করতেন?
উত্তর: মেডিকেলে সুযোগ না পেলে আমি দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতাম। ডাক্তারি বাদে যদি অন্য কোনো পেশার কথা ভাবতাম, তবে সেটা হতো মাছ ধরা। ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়ির পাশে বিল ও পুকুর ছিল, যেখানে সবাই মাছ ধরত। আমি তখন সরাসরি ধরতে পারতাম না, কিন্তু তাদের দেখে খুব আনন্দ পেতাম। মনে আছে, একবার আমি একটি কই মাছ ধরেছিলাম এবং বাড়িতে পানি দিয়ে রেখেছিলাম। মাছের প্রতি আমার তখন থেকেই খুব আগ্রহ জন্মেছে।
গ্রামের ছেলে মেয়েরা তো খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত থাকে, কোনো মজার স্মৃতি আছে আপনার?
উত্তর: খেলাধুলা করতাম প্রচুর। ছোটবেলা থেকে গ্রামে থাকায় অনেক বন্ধু-বান্ধব ছিল। ক্লাস ওয়ান থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি খেলাধুলা করেছি। এরপর করোনা এসে বাড়িতে একটি থমথমে অবস্থা সৃষ্টি করে, বাইরে বের হওয়ার সুযোগ হয়নি। তখন থেকে খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে খুব বেশি খেলাধুলা করা হয়নি।
প্রথম তো হলেন, এবার পরবর্তী লক্ষ্য কী?
উত্তর: প্রথম লক্ষ্য হলো আগে ভালোভাবে এমবিবিএস শেষ করা। অনেকেই বলে, মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষাই সবচেয়ে সহজ, কিন্তু সামনের পরীক্ষাগুলোই মূলত কঠিন। আমার মূল লক্ষ্য হলো যেভাবে ভালোভাবে পড়াশোনা করে মেডিকেলে সুযোগ পেয়েছি, সেটি বজায় রাখা।
স্পেসিফিক কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন দেখেন?
উত্তর: আমার একটি বিশেষ দিক হলো, কোনো দিকে যাবার আগে আমি সেই বিষয় ভালোভাবে বুঝি এবং বিশ্লেষণ করি। যেহেতু আমি মাত্র ভর্তি হয়েছি, আগামী পাঁচ বছর ভালোভাবে পড়াশোনা করব এবং আগে বিষয়গুলো ভালোভাবে জানার চেষ্টা করব। এরপর দেখব কোন বিষয়টি আমার বেশি ভালো লাগে এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু এই মুহূর্তে বলতে গেলে, অনকোলোজি আমার বেশি আগ্রহের—অর্থাৎ আমি একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হতে চাই। ভবিষ্যতে এটি পরিবর্তনও হতে পারে।
যারা সামনে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের জন্য পরামর্শ কী? মেডিকেল প্রস্তুতি আসলে কখন থেকে শুরু করা উচিত বলে মনে করেন?
উত্তর: পরামর্শ বলতে, অনেক পরিশ্রম করার মানসিকতা রাখা জরুরি। এ ছাড়া সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা থাকতে হবে। ত্যাগ করার মানসিকতাও থাকতে হবে—ঘোরাঘুরি করা বা মোবাইল নিয়ে সময় কাটিয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় না। যদি ভালো কিছু করতে চাই, এসব ত্যাগ করতে হবে। মেডিকেলের প্রস্তুতি শুরু করা উচিত এইচএসসির শুরু থেকে। যারা যত আগে শুরু করবে, তারা তত এগিয়ে থাকবে।