দেশের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের বড় একটি অংশ বিষণ্নতার বিভিন্ন মাত্রার লক্ষণে ভুগছেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ৭৪ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০ দশমিক ৯ শতাংশের ক্ষেত্রে লক্ষণ অত্যন্ত তীব্র পর্যায়ের।
আজ বুধবার বেলা ৩টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
মানসিক স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বন্ধু’ (BONDHU) এবং যুব উন্নয়ন ও নীতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংকট্যাংক’ (BYTT) যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গবেষণার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষক ও নীতিবিশ্লেষক মাহাদী-উল-মোর্শেদ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ও বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংকট্যাংকের সাধারণ সম্পাদক শেখ রিফাদ মাহমুদ। প্রতিবেদন উপস্থাপন ও আলোচনা শেষে সমাপনী বক্তব্য দেন সংগঠনটির সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংকট্যাংকের পরিচালক কাজী সাদ্দাম হোসেন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুজাউল ইসলাম।
‘সোসিও-ডেমোগ্রাফিক প্রেডিক্টরস অব ডিপ্রেশন অ্যামং ইউনিভার্সিসিটি স্টুডেন্টস ইন বাংলাদেশ: এভিডেন্স ফ্রম রিগ্রেশন মডেলিং’ শীর্ষক গবেষণাটি দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী ৪২২ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত হয়। বিষণ্নতার লক্ষণ পরিমাপে গবেষকেরা ডিপ্রেশন অ্যানজাইটি স্ট্রেস স্কেল-২১ (DASS-21)-এর বাংলা সংস্করণের বিষণ্নতা উপ-স্কেল ব্যবহার করেন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১২ দশমিক ৩ শতাংশের বিষণ্নতার লক্ষণ মৃদু, ২৮ দশমিক ৭ শতাংশের মাঝারি, ১২ দশমিক ৩ শতাংশের তীব্র ও ২০ দশমিক ৯ শতাংশের অত্যন্ত তীব্র পর্যায়ে ছিল।
গবেষণায় পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, আত্মহত্যার চিন্তা, অনিয়মিত ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতাকে বিষণ্নতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ২৯ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়মিত পড়াশোনার জন্য দিনে এক ঘণ্টাও সময় দেন না। দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, ঘুম থেকে ওঠার আধা ঘণ্টার মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। এ ছাড়া ২২ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন বলে মনে করলেও তা নিতে পারছেন না।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ও গোপনীয় মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালুর সুপারিশ করেছে গবেষণা দল। পাশাপাশি সহজলভ্য পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দৈনন্দিন জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়। শিক্ষার্থীদের সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।