শুভ আহম্মেদ পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। সম্প্রতি ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ‘সিভিল জজ’ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আজকের পত্রিকার আনিসুল ইসলাম নাঈম।
নেত্রকোনা জেলার হাওরবেষ্টিত উপজেলা খালিয়াজুরীর প্রত্যন্ত গ্রাম জগন্নাথপুর। সেখানে মেন্দিপুর ইউনিয়নের ধনু নদের তীরে অবস্থিত এই গ্রামে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন শুভ। তাঁর বাবা পেশায় কাপড় ব্যবসায়ী ও কৃষক, মা গৃহিণী।
হাওরবেষ্টিত হওয়ায় বর্ষাকালে তাঁদের গ্রামগুলো দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। ট্রলার বা নৌকা ছাড়া যোগাযোগের অন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বছরে অন্তত ছয় মাস পানিবন্দী অবস্থায় থাকতে হতো। গ্রামের প্রতিটি মানুষকেই দীর্ঘ সংগ্রাম ও কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
ছোটবেলা থেকে শুভর জীবনবোধ ছিল বেশ গভীর। তিনি ভাবতেন, জীবনে এমন কিছু করতে হবে, যাতে নিজের পরিবার ও বংশের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসার পথ সব সময়ই সংগ্রামের। সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে শুভকে।
ছোটবেলা থেকে মেধাবী ছিলেন শুভ আহমেদ। তিনি জগন্নাথপুর ময়েজ উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। ওই বিদ্যালয় থেকে তিনিই প্রথম জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
এরপর ময়মনসিংহের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হন। ২০১৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়ে সাফল্য ধরে রাখেন তিনি। এরপর শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় নবম স্থান অর্জন করেন হাওরের সন্তান শুভ। এরপর পড়াশোনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগকে বেছে নেন।
প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ছিল না শুভর। তাঁর ইচ্ছে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভালো অবস্থান করা। ‘বি’ ইউনিটে নবম স্থান অর্জনের মাধ্যমে সেই ইচ্ছে পূরণ হয়। এরপর অনেকের পরামর্শে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ভর্তির পর বড় ভাইদের দেখে অনুপ্রাণিত হন তিনি। ধীরে ধীরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরিকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেন। সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ তাঁর নিজের ছিল। পাশাপাশি শুভর মা-বাবাও তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার জন্য উৎসাহ দিতেন।
প্রস্তুতির ক্ষেত্রে শর্টকাট পদ্ধতি অনুসরণ করেননি শুভ। সব সময় কোনো একটি বিষয় ধরে বিস্তারিত পড়ার চেষ্টা করতেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর থেকে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করেন। একই সঙ্গে বিসিএস ও বিজেএস পরীক্ষাকে লক্ষ্য করে প্রস্তুতি নেন। বিশেষভাবে সাধারণ বিষয়গুলো এমনভাবে পড়েছেন, যাতে বিসিএস ও বিজেএস দুটো পরীক্ষার প্রস্তুতিই নেওয়া যায়। ৩০ দিনভিত্তিক পরিকল্পনায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনার রুটিন ছিল তাঁর। প্রতিদিনের জন্য আলাদা রুটিন তৈরি করতেন। কী কী পড়তে হবে, তা আগে থেকে রুটিনের খাতায় লিখে রাখতেন। এরপর তা পূরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন।
পড়াশোনা ভালো লাগত তাঁর। পড়ার সময় অনলাইন থেকে দূরে থাকতে মোবাইল ফোন রুমে তালাবদ্ধ করে রাখতেন। অতি প্রয়োজন ছাড়া ল্যাপটপও ব্যবহার করতেন না। সকালে রিডিং রুমে পড়া শুরু করতেন, ফিরতেন রাত ১২টার দিকে। এর মধ্যে শুধু খাওয়া-দাওয়া ও প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বিরতি নিতেন। এভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় ‘সিভিল জজ’ পদে ৮০তম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন শুভ।
১৮তম বিজেএস পরীক্ষা নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না শুভর। লিখিত পরীক্ষা সন্তোষজনক হয়নি তাঁর। তবু সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন রেজাল্ট প্রকাশ হলো, অল্প সময়ের মধ্যেই আমার রোল খুঁজে পেয়েছিলাম। আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। জীবনের সেরা মুহূর্ত ছিল এটি।’ বিচারক হওয়ার এই যাত্রায় শুভর মা-বাবা ও মামা তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর আর্থিক সমস্যার বিষয়টিও তাঁরা সব সময় গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার একজন পরীক্ষার্থীর জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে মনে করেন শুভ। বিভিন্ন গ্রুপ থেকে বিসিএস ও বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি, গাইডলাইন ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়। পড়াশোনাভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত থাকা যায়। তবে তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যতটা সাহায্য করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে। তিনি বলেন, ‘আমার প্রচুর ফেসবুক আসক্তি আছে। তাই নিয়ন্ত্রণ করতে বেগ পেতে হয়েছে। আলাদা একটা বাটন ফোন ব্যবহার করি, যাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করতে না হয়। তবে দৈনিক এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি সময় মোবাইলে দেওয়া অনুচিত।’
শুভর ভাষায়, মোবাইল ও পড়াশোনা দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। অবশ্যই মোবাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, মোবাইলের দাস হওয়া যাবে না।
আগামী দিনের জজদের উদ্দেশে শুভ বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুনদের অবশ্যই প্রতিদিন রুটিন করে পড়তে হবে। পড়ার মাঝে তুচ্ছ কাজে ছন্দপতন করা যাবে না। মোবাইলের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শর্টকাট বা সাজেশনের পেছনে না ছুটে বিস্তারিত পড়তে হবে। দৈনিক পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হবে। ব্যক্তিগত নোট তৈরি করতে পারলে ভালো। আত্মবিশ্বাসী হয়ে শেষ পর্যন্ত লেগে থাকতে হবে। সুপরিকল্পিত পরিশ্রম বৃথা যায় না। ভবিষ্যতে পেশাগত জীবনে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চান শুভ। জেলা জজ হওয়ার পাশাপাশি অদূরভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবেও নিজেকে দেখার স্বপ্ন রয়েছে এই তরুণের।