গতকাল মেলায় প্রবেশ করতেই ঢাকের মৃদু আওয়াজ। রমনা কালীমন্দিরের দিকে বেশ ভিড়। সেখানে উপস্থিত লোকজনের পরনে নতুন জামাকাপড়। অনেকের মুখে আবিরের রং। দোলযাত্রায় আসা পুণ্যার্থী তারা। সেখান থেকে দুই তরুণী মেলায় ঢুকে পড়লেন হাতে আবির নিয়ে। খানিক মাখিয়ে দিলেন বন্ধুদের। আবিরের সেই রং যেন ছড়িয়ে পড়ল পুরো মেলায়। একদিকে মুসলিমদের পবিত্র মাহে রমজান, অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের পরব দোলযাত্রার আনন্দ আর সর্বজনীন উপলক্ষ একুশের চেতনার আলো মিলেমিশে একাকার। গতকাল বইমেলা প্রাঙ্গণে এই সম্প্রীতির ছবি মন ভালো করে দিল।
বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থী প্রীতি ধর বান্ধবী সুমনা বিশ্বাসকে নিয়ে দোলযাত্রা উপলক্ষে মন্দিরে এসেছিলেন। উৎসবে হাজিরা দিয়ে এসেছেন বইমেলায়। সুমনা বললেন, ‘দোলযাত্রায় এসেছিলাম। ভাবলাম, এসেছি যখন, বইমেলা ঘুরে যাই। এবার অত ভিড় নেই বলে ভালো লাগছে।’
বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর ধর্মীয় উৎসব-পার্বণের সহাবস্থানের কথা তুললে সুমনা বললেন, ‘আমাদের তো কখনোই মনে হয় না আলাদা। আমার অনেক মুসলমান বান্ধবী আছে। আমরা একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছি। এটাই তো আমাদের বাংলাদেশ।’
একটি স্টলের সামনে সারিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন ধর্মীয় শিক্ষায়তনের পোশাক পরা বেশ কয়েকজন তরুণ। জানা গেল, তানজিমুল উম্মাহ আলিম মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তারা। মাদ্রাসাটির কর্মকর্তা আব্দুল আলীম ছিলেন তাদের সঙ্গে। তিনি জানালেন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের বইয়ের দিকে আগ্রহী করতে বইমেলায় নিয়ে আসেন। একেক দিন একেক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসেন।
গতকাল মেলার মূলমঞ্চে ছিল আমাদের অন্যতম জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠান। সেখানে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের এমন কিছু সময় ও ঘটনার মুখোমুখি করে, যেটাকে আমরা বলি ক্রান্তিকাল। তাজউদ্দীন আহমদ এমনই একটি সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন ১৯৭১ সালে। ওই সময়টি তাঁর এবং সমগ্র জাতির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তাজউদ্দীন আহমদ রাজনীতিতে যত দিন সক্রিয় ছিলেন, তত দিন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন।’
অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘তাজউদ্দীন আহমদ যেভাবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে এসেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিশীলিত মনোভাব, শিক্ষিত মনন ও দূরদৃষ্টিই তাঁকে নেতা করে তুলেছিল।’
নতুন বইয়ের খোঁজে
গতকাল অমর একুশে বইমেলার ষষ্ঠ দিনে তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ৬৫টি। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, চিত্তরঞ্জন দাস, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও ড. এ আর মল্লিককে নিয়ে ৬টি প্রবন্ধের সংকলন এনেছে আগামী প্রকাশনী। ‘মজলুম জনতার মওলানা ভাসানী ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ নামে বইটির লেখক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে লেখা স্লোগান আর গ্রাফিতি নিয়ে ‘মুক্তির দেয়াল: বর্ষা বিপ্লবের দ্রোহলিপি’ নামের অ্যালবাম বের করেছে ঐতিহ্য।
গানের মানুষ শিল্পী লুৎফর হাসান এবারের বইমেলায় হাজির হয়েছেন কবিতা নিয়ে। ‘জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে তোমাকে পাচ্ছি না’ শিরোনামে বইটি বের করেছে অন্যপ্রকাশ।
বনজঙ্গল ও রহস্যরোমাঞ্চ নিয়ে লেখালেখি করা ইশতিয়াক হাসানের দুটি বই এনেছে কথাপ্রকাশ। ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ ও লেখক জর্জ পি স্যান্ডারসনের বইয়ের অনুবাদ ‘বাংলার পাহাড়ে-জঙ্গলে: ঢাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ এবং বিশ্বের নানা বিচিত্র বিষয় নিয়ে সংকলন ‘অদ্ভুত ৫০’। দেড় শ বছর আগের গহিন বনে ঢাকা অতি দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রামকে খুঁজে পাওয়া যাবে ‘বাংলার পাহাড়ে-জঙ্গলে: ঢাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বইটিতে। কথাপ্রকাশের স্টলের সামনে থাকা লেখক ইশতিয়াক জানালেন, ‘অশুভ পাহারাদার’ নামে তাঁর ‘নাহিদ দ্য ইনভেস্টিগেটর’ সিরিজের নতুন বই এসেছে ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে।
অন্যান্য আয়োজন
‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আলী আহমদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি সাখাওয়াত টিপু। আবৃত্তি পরিবেশন করেন এ কে এম দিদার উদ্দিন ও অনন্যা লাবণী। এ ছাড়া ছিল জারিন তাসনিম ঐশ্বর্যর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐকান্তিক শিল্পীগোষ্ঠী’ এবং দীপ্তি রাজবংশীর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ লোকসঙ্গীত পরিষদ’-এর পরিবেশনা।
আজ বুধবার মেলা শুরু হবে বেলা ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।