রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকার শেরে বাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটের সামনে গতকাল শুক্রবার দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে যুবদলের এক কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এক পথচারীও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গত মঙ্গলবার রাজারবাগ বাজারে পানির পাম্পসংলগ্ন একটি মুদি দোকানের সামনে বিএনপি কর্মী মো. পলাশকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে তাঁর দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করা হয়, পরে বুকে ছুরিকাঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
এর কয়েক দিন আগে আদাবরে সালিস বৈঠকের বিরোধকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. আবুল বাশার। অপরাধমূলক এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, ঘটছে কিছুদিন পরপরই। নিহতের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়, উদ্বেগজনক।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত ৬ মাসে এমন হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ১৭৭৮ জন। আর এসবের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত, দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারে আধিপত্য, জমি–জমার দ্বন্দ্ব, আর্থিক বিরোধ, ধর্ষণের পর হত্যা, চুরি-ছিনতাইসহ নানা কারণ। তবে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত বিরোধ।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আজকের পত্রিকাকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের বড় কারণ রাজনৈতিক সহিংসতা নয়; বরং ব্যক্তিগত বিরোধ, জমিজমা-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব ও প্রতিহিংসা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যদিও পুলিশের দাবি, আগের বছরের তুলনায় হত্যার সংখ্যা কমেছে এবং পরিস্থিতির আরও উন্নতি হচ্ছে।
সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনের দাবি, নির্বাচনের পর সামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত (৬ মাস) ১ হাজার ৭৭৮ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৩১। ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতাসহ বিভিন্ন কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২৮৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০ এবং জুনে ৩২৬ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে গত বছরের একই সময়ে জানুয়ারিতে ২৯৪, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০, মার্চে ৩১৬, এপ্রিলে ৩৩৬, মে মাসে ৩৪১ এবং জুনে ৩৪৪ জন নিহত হন।
পুলিশের ভাষ্য, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেই সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশের দাবি, যদিও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধের হত্যাকাণ্ডকেই পরবর্তীতে আবার রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি সরকার গঠন করে ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় হত্যাকাণ্ড কিছুটা কমেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক জবাবদিহি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বাড়ে। এর ইতিবাচক প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে। তবে এই ধারা স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের নীতি, অপরাধ দমন কৌশল, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক তৎপরতার ওপর।
এ দিকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে নারী-শিশু নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বাচনী সহিংসতা ও মব সহিংসতাসহ বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ২৮০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৬ জন। নিহতদের মধ্যে ৩১ জনই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম জানান, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যবসায়িক, সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধও হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ।
এই অপরাধ বিশ্লেষকের মতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিরতা অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। অনেক সময় অরাজনৈতিক বা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকায় হত্যাসহ গুরুতর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। নির্বাচিত সরকারের অধীনে সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক ও কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই।