হোম > অপরাধ

জুয়ায় দিনে ৩০ নতুন সাইট

আমানুর রহমান রনি, ঢাকা

প্রতীকী ছবি

একটি জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ হয়, কিছুদিন পর একই ধরনের আরেকটি সাইট হাজির। একটি অ্যাপ সরিয়ে দেওয়া হলে নতুন নামে আবার চালু হয় কার্যক্রম। এভাবে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি জুয়ার সাইট খোলা হয়। প্রযুক্তির এই ফাঁক গলে দেশে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে অনলাইন জুয়া।

পুলিশের হিসাব বলছে, বর্তমানে দেশে ৫৮৬টি জুয়ার সাইট সক্রিয়। এসব জুয়ার ওয়েবসাইটে অবৈধ লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে ৩ হাজার ৮৬৪টি মোবাইল ব্যাংকিং (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট। এতে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়।

অনলাইন জুয়ায় লেনদেন হওয়া টাকার বড় অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ বলছে, জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস নিয়মিত বন্ধের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) তালিকা দেওয়া হয়। তারা বন্ধও করে, তবে জুয়াড়িরা নতুন সাইট খুলে আবার শুরু করে। তাই অনলাইন জুয়া একেবারে বন্ধ করা যাচ্ছে না। কারণ, সাইট ও অ্যাপের অনেকগুলোর নিয়ন্ত্রণ দেশের বাইরে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সূত্র বলছে, গত ৬ মে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত চারজনকে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৭ মে নরসিংদী ও ঢাকার ধানমন্ডি থেকে আরও ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে একটি মামলা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ, সজীব চক্রবর্তী, আশরাফুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, তৈয়ব খান, সৌমিক সাহা, মো. কামরুজ্জামান ও আবদুর রহমান।

ওই মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে আসছিল চক্রটি। এসব প্ল্যাটফর্মে জুয়াড়িরা বিকাশ, রকেট, নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে লেনদেন করত। পরে ওই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হতো।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট জানিয়েছে, ওই চক্র চারটি ওয়েবসাইট খুলে জুয়া শুরু করেছিল। এসব ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার একটি চক্রের হাতে ছিল। তারা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা পাচার করেছে। পাচার হওয়া অর্থ সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ফেরত আনার কাজ চলছে। চক্রটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো ওয়ালেট শনাক্ত করা হয়েছে।

চক্রের নিয়ন্ত্রণ বিদেশে থাকলেও দেশে তাদের এজেন্ট, সাব-এজেন্ট এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজস্ব লোক রয়েছে; যারা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে সেগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে পাচার করত। তারপর ক্রিপ্টোকারেন্সি যেসব দেশে বৈধ, সেখান থেকে সেগুলো ডলারে রূপান্তর করে।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, গত ১ মে থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৫৮৬টি অনলাইন জুয়ার সাইট সক্রিয় রয়েছে। এসব সাইটে জুয়ার লেনদেনে ৩ হাজার ৮৬৪টি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও ১৯৮টি ব্যাংক হিসাব ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অসংখ্য এজেন্ট নম্বর রয়েছে। জুয়াড়িরা বিভিন্ন এমএফএস কোম্পানির ব্যক্তিদের সঙ্গে কারসাজি করে এই এজেন্ট নম্বর সংগ্রহ করে। আবার কেউ কেউ দৈনিক এজেন্ট নম্বর ভাড়া নিয়ে জুয়ার টাকা জুয়াড়িদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে।

পুলিশ জানায়, গত ৮ জুন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী থেকে মোস্তাক মিয়া নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বিকাশ ও নগদ এজেন্ট ব্যবসা রয়েছে। তবে এই ব্যবসার আড়ালে ১০ থেকে ১১টি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইটের টাকা তাঁর ওই নম্বরে লেনদেন হতো। জুয়ার ওয়েবসাইটের অপরাধীরা তাকে কমিশন দিয়ে সেখানে লেনদেন করত।

ভূরুঙ্গামারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুনতাসির মামুন মুন বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, একেকটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকে ৩০ হাজার থেকে ৫/১০ লাখ টাকা লেনদেন করে চক্রটি। এজেন্ট নম্বরগুলোতে কখনো কখনো এর বেশি লেনদেন হয়। সেই হিসাবে সিআইডির পর্যবেক্ষণ, বর্তমানে সক্রিয় ৩ হাজার ৮৬৪টি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে দৈনিক সারা দেশে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয়।

সিআইডি জানিয়েছে, জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করা হয় রাশিয়া, চীন, হংকং, ভিয়েতনাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে।

সিআইডির সিপিসি ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাইফউদ্দীন শাহীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের সাইবার প্যাট্রল টিম নিয়মিত এসব জুয়ার সাইট মনিটরিং করে। তারা দৈনিক যেসব জুয়ার সাইট পায়, সেগুলো বন্ধ করতে আমরা নিয়মিত বিটিআরসিকে তথ্য ও তালিকা দিই। ৫৮৬টি ওয়েবসাইট বন্ধ করতেও তালিকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিংগুলোর বিষয়েও তথ্য দেওয়া হয়েছে।’

৫ বছরে ৫১০৯ ওয়েবসাইট, ৪৫০ অ্যাপ বন্ধ করেছে বিটিআরসি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস বন্ধে তালিকার সুপারিশ পাওয়ার পর সেগুলো বন্ধ করে বিটিআরসি। সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫ হাজার ১০৯টি জুয়ার ওয়েবসাইট এবং ৪৫০টি অ্যাপ বন্ধ করেছে তারা।

কেন পুরোপুরি বন্ধ হয় না

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, একজন ব্যবহারকারী প্রথমে কোনো জুয়ার সাইট বা অ্যাপে ঢুকে মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করেন। এরপর নির্দিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর বা ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠিয়ে তার জুয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থ যোগ করেন। জিতলে একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। ফলে ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলেই পুরো চক্র ভেঙে পড়ে না। কারণ, জুয়ার সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বরগুলোতে নতুন ওয়েবসাইট খুলেই জুয়াড়িরা বার্তা পাঠিয়ে দেয়। বকেয়া টাকাও পরিশোধ করে। এই পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকায় পুনরায় তারা সংগঠিত হয়।

এরই মধ্যে অনলাইন জুয়া, হুন্ডি ও অন্যান্য আর্থিক অপরাধে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সিআইডি। এ ছাড়া গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় ৫৫ হাজার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত বা ফ্রিজ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

প্রযুক্তিবিদ ও আইনজীবী তানভীর হাসান জোহা বলেন, একটি সাইট বন্ধ করলে অপরাধীরা নতুন সাইট নিয়ে ফিরে আসতে পারে। তাই তাদের সাইট, অ্যাপ, ব্যবহারকারী, এজেন্ট, এমএফএস, ব্যাংক হিসাব ও অর্থের গন্তব্য–এই পুরো চেইনকে আইনের আওতায় আনতে পারলে জুয়ার নেপথ্যের মূল হোতারা বের হয়ে আসবে। তবে এই তদন্ত অনেক সময়সাপেক্ষ ও জটিল। তাই ধীরে চলে মামলা।