জেনসেন হুয়াং
১৯৯৩ সাল। ডেনির একটি রেস্তোরাঁয় কফি খেতে বসেছিলেন তিন প্রকৌশলী—জেনসেন হুয়াং, ক্রিস মালাখোস্কি ও কার্টিস প্রিয়েম। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটি চিপ কোম্পানি গড়ে তোলা। সাফল্যের নিশ্চয়তা ছিল না। ছিল শুধু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা।
সেই উদ্যোগ থেকেই যাত্রা শুরু এনভিডিয়ার। তিন দশক পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চিপের চাহিদায় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ৪ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার।
৬৩ বছর বয়সী জেনসেন হুয়াং এখন এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। তাঁর মতে, এনভিডিয়ার তৈরি প্রযুক্তি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্যও সুযোগ তৈরি করছে।
ওয়াই কম্বিনেটরের স্টার্টআপ স্কুল ২০২৬-এ প্রতিষ্ঠানটির সিইও গ্যারি ট্যানের সঙ্গে আলোচনায় হুয়াং বলেন, ‘কোম্পানি শুরু করার জন্য এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো সময়।’ তরুণ উদ্যোক্তাদের সামনে থাকা সুযোগ দেখে তিনি নিজেকে ঈর্ষা করেন বলেও জানান।
ক্যারিয়ারে বড় কিছু করতে গেলে অনিশ্চয়তা থাকবেই। তাই সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকা ঠিক নয় বলে মনে করেন হুয়াং। তিনি বলেন, ‘নতুন কিছু শুরু করার আগে আমরা প্রায়ই পুরো পথ নিয়ে চিন্তা করি। কী কী সমস্যা হতে পারে, কোথায় ব্যর্থতা আসতে পারে, কীভাবে তা সামলাব—এসব একসঙ্গে ভাবতে থাকি। এতে কাজ শুরুর আগেই ভয় তৈরি হয়।’
হুয়াং আরও বলেন, ‘সমস্যা কত বড়, সেটি যেন কাজ শুরু করার পথে বাধা না হয়; বরং নিজেকে প্রশ্ন করুন, কতটা কঠিন হতে পারে? পুরো পথ একসঙ্গে পাড়ি দেওয়ার কথা না ভেবে সামনে থাকা ধাপটি পার হওয়ার দিকে মন দিন। পরের ধাপের সমস্যা তখনই সামলাতে হবে।’ অর্থাৎ, পুরো পথের অনিশ্চয়তা নিয়ে না ভেবে সামনে থাকা কাজটিতে মনোযোগ দেওয়াই তাঁর পরামর্শ।
গত বছর ‘দ্য জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স’ অনুষ্ঠানে হুয়াং তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে থাকা একটি অনুভূতির কথা বলেন। সেটি হলো, নিজেকে অরক্ষিত মনে হওয়া, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা। এনভিডিয়ার সঙ্গে ৩৩ বছরের যাত্রাতেও এই অনুভূতি ছিল বলে জানান তিনি। তাঁর কাছে কোম্পানিটিকে সব সময় এমন মনে হয়েছে, যেন সেটি মাত্র ৩০ দিন টিকে থাকার অবস্থায় আছে। এ থেকে হুয়াংয়ের একটি বিষয় স্পষ্ট—কাজ শুরু করার আগে সব ভয় দূর হয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অনিশ্চয়তা থাকবে। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
হুয়াংয়ের আরেকটি শিক্ষা হলো শেখার মানসিকতা। শুরুতেই সব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি নয়। বরং প্রয়োজন হলে উত্তর খুঁজে নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। এনভিডিয়ার শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি ভুল গ্রাফিকস প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছিল। সেই ভুল থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবে, সেটি তারা জানত না। তাই উত্তর খুঁজতে তারা শেখা শুরু করেন। হুয়াং স্মৃতিচারণা করে বলেন, একবার কয়েক শ ডলার নিয়ে তিনি ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকান ফ্রাইসে যান। সেখান থেকে প্রকৌশলীদের জন্য তিনটি প্রযুক্তিবিষয়ক বই কেনেন। প্রকৌশলীরা বইগুলো পড়ে নতুন করে শেখেন। হুয়াংয়ের কাছে অর্থ সংগ্রহ আর বই পড়ে শেখা—দুটিই ছিল কোম্পানি গড়ার প্রক্রিয়ার অংশ। অর্থাৎ, কাজ শুরু করার পরও শেখার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। প্রযুক্তি ও বাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে আজকের জানা বিষয় ভবিষ্যতে বদলে যেতে পারে। তাই শুরুতে কে কতটা জানে, তার পাশাপাশি কে কত দ্রুত শিখতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন কিছু শুরু করার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকবেই। অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বাজারের পরিবর্তনও উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে এআই বিভিন্ন শিল্পের কাজের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
তবে হুয়াংয়ের বক্তব্যকে সাফল্যের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি মূলত শুরু করার মানসিকতার কথা বলছেন। এখন কিছু শুরু করা নিরাপদ—এমন নয়। কিন্তু নিরাপদ সময়ের অপেক্ষায় থাকাও একধরনের ঝুঁকি। কারণ, অপেক্ষা করতে করতে হয়তো শুরুই করা
হবে না।
ডেনির সেই রেস্তোরাঁয় তিন প্রকৌশলীর যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান কোম্পানিতে রূপ নিয়েছে। তবে হুয়াং বলছেন না, সবার সাফল্য একই রকম হবে। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুরু করার মানসিকতা সবার জন্য উন্মুক্ত। সব উত্তর জানা থাকতে হবে না। না জানলেও শেখা যাবে। সব ভয় দূর হবে না। ভয় নিয়েই এগোতে হবে। সব পথ পরিষ্কার হবে না। সামনে যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুই এগিয়ে যেতে হবে। বাস্তবতা মেনে নেওয়া, ভুল থেকে শেখা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ শুরু করা—এই মানসিকতা হতে পারে নতুন কিছু করার শক্তি। তাই তিন দশক পরও ১৯৯৩ সালের সেই সহজ প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক—কতটা কঠিন হতে পারে?
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া