পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকটের মধ্যেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে গত শুক্রবার একগুচ্ছ চুক্তি সই করেছে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এর মধ্যে রয়েছে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের রূপরেখা, ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে ৩ কোটি ব্যারেল তেল সংরক্ষণ, এলপিজি সরবরাহ এবং গুজরাটের ভাদিনারে একটি জাহাজ মেরামত ক্লাস্টার স্থাপন। এ ছাড়া ভারতের অবকাঠামো খাত, আরবিএল ব্যাংক এবং সম্মান ক্যাপিটালে মোট ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আরব আমিরাত।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার মাত্র কয়েক দিন পরই চার ইউরোপীয় দেশ সফরের অংশ হিসেবে আবুধাবিতে পা রাখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর এই সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি দুই দেশের সম্পর্কের এক বড় ধরনের অগ্রগতি নির্দেশ করে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ‘মুক্ত, উন্মুক্ত ও নিরাপদ’ থাকা উচিত—এমন বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে বলেন, ভারত সব সময় আমিরাতের ‘পাশে’ আছে। আমিরাতে হামলার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ‘অনভিপ্রেত’।
এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় ভারতের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন মোদি। প্রেসিডেন্টকে ‘আমার ভাই’ বলে সম্বোধন করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি সংযুক্ত আরব আমিরাত যেভাবে সংযমের সঙ্গে সামাল দিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশে আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব।’
পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভারত সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দুই নেতা বেশ কয়েক দফায় বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আলোচনা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং আমিরাতের নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি গভীর সংহতি প্রকাশ করেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত এবং নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার পক্ষে ভারতের স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন, যা আঞ্চলিক দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে স্বাগত জানান আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। বিশেষ সম্মাননা হিসেবে তাঁর বিমানটিকে আমিরাতি বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান দিয়ে এসকর্ট বা পাহারা দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আবুধাবি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানানোর ‘উদার আতিথেয়তার’ জন্য প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান মোদি। সেই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত ভারতীয় সম্প্রদায়কে ‘পরিবারের সদস্যের’ মতো দেখভাল করার জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
আমিরাতের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব রয়েছে। আজ আমরা আলোচনায় মূলত জ্বালানি ও প্রযুক্তিসহ অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছি। আমাদের দেশগুলোর দীর্ঘস্থায়ী অগ্রগতি এবং পুরো অঞ্চল ও বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
ভারতের দিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিতে আসা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করার ঠিক পরদিনই মোদি সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে যান।
এই সফরের অন্যতম প্রধান ফোকাস বা কেন্দ্রবিন্দু ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দুই নেতাই দুই দেশের ক্রমবর্ধমান ও প্রাণবন্ত জ্বালানি অংশীদারত্বের প্রশংসা করেছেন। অপরিশোধিত তেল, এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের জ্বালানি সুরক্ষায় সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তার ভূমিকা বজায় রেখেছে। নেতারা একটি সমন্বিত জ্বালানি অংশীদারত্বের জন্য নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে, ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেড এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির মধ্যে একটি কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি সম্পন্ন হওয়াকে তাঁরা স্বাগত জানিয়েছেন। এর ফলে ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ কোটি ব্যারেলে দাঁড়াবে এবং তারা ভারতে কৌশলগত গ্যাস রিজার্ভ স্থাপনে একসঙ্গে কাজ করবে।’
এ ছাড়া ইন্ডিয়ান অয়েল লিমিটেড (আইওসিএল) এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডনক) মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি এলপিজি সরবরাহের চুক্তিকেও স্বাগত জানান তাঁরা।
গত বছর ভারতের অপরিশোধিত তেলের চতুর্থ বৃহত্তম উৎস ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, যা ভারতের মোট চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশ পূরণ করেছে। এ ছাড়া আমিরাত ভারতের এলপিজির সবচেয়ে বড় উৎস, যা দেশের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশের জোগান দেয়।
ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভের অংশীদার প্রথম দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০১৮ সালে আইএসপিআরএল এবং এডনক একটি চুক্তি করে, যার অধীনে ম্যাঙ্গালুরুতে আইএসপিআরএলের স্থাপনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
আইএসপিআরএল হলো ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা দেশের কৌশলগত অপরিশোধিত তেলের মজুত বজায় রাখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি তিনটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ৫.৩৩ এমএমটি (মিলিয়ন টন) অপরিশোধিত তেল মজুত রাখে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিনিয়োগের তিনটি প্রধান অংশ থাকবে: আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (এডিআইএ) এবং ভারতের ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (এনআইআইএফ) যৌথভাবে ভারতের অবকাঠামো খাতে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজবে; এমিরেটস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ইএনডিবি) ভারতের আরবিএল ব্যাংকে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে; এবং ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানি ভারতের সম্মান ক্যাপিটালে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘এই বিনিয়োগগুলো ভারতের প্রবৃদ্ধির গল্পের প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিরই বহিঃপ্রকাশ এবং এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত বিনিয়োগের অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হবে।’
প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে এতে বলা হয়েছে, দুই দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে তাঁদের সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের রূপরেখা’ সই হওয়াকে স্বাগত জানান তাঁরা। এর অধীনে দুই পক্ষ প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা গভীর করতে এবং উদ্ভাবন ও উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা, নিরাপদ যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্যালয় জানিয়েছে।