যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিফ করতে যাচ্ছে। এই খবর প্রকাশের পরই বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বিবিসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারের বেশি হয়ে যায়। যদিও পরে তা কিছুটা কমে আসে। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং কূটনৈতিক আলোচনায় অচলাবস্থাকে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের বিরুদ্ধে ‘সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে। পরিকল্পনাটিতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। পাশাপাশি আরেকটি পরিকল্পনায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা যায়। তবে এই ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়নে স্থলবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুট কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং দাম বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে, বিশেষ করে পেট্রল ও ডিজেলের ওপর।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশে ভোক্তাদের ওপর চাপ বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যে পেট্রলের গড় দাম এখন প্রতি লিটার ১৫৭ পেন্স, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ২৪ পেন্স বেশি। ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু পরিবহন খরচ নয়, বরং খাদ্য, বিদ্যুৎ ও বিমান ভাড়ার মতো অন্যান্য খরচও বাড়িয়ে দেবে।
এদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা হুমকি দেওয়া হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত রাখবে এবং ‘শত্রুর অপব্যবহার’ প্রতিরোধ করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, ইরান যদি জাহাজ চলাচলে হুমকি অব্যাহত রাখে, তবে তারা ইরানি বন্দরগুলো অবরোধ করে রাখবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম ১২৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। কারণ, এটি সরাসরি মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়।
এ ছাড়া সার উৎপাদনে ব্যবহৃত ইউরিয়ার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষি খাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে আগামী মাসগুলোতে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলবে।