হোম > অর্থনীতি > বিশ্ববাণিজ্য

তেলের বাজারের বিরাট উল্লম্ফন, ব্যারেল ছাড়াল ১১০ ডলার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: এএফপি

ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যরল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পণ্য পরিবহনে দীর্ঘমেয়াদী অচলাবস্থার আশঙ্কায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

গতকাল রোববার ইরান তাদের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মুজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করেছে। যুদ্ধের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটির শাসনভার এখনো বর্তমান রেজিমের হাতেই রয়েছে।

এদিকে গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্যবস্তু ছিল তেল ডিপোগুলো। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে এই বড় ধরনের বিঘ্ন বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।

আজ সোমবার সকালে এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে ১১৪ দশমিক ৭৪ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে নাইমেক্স লাইট সুইট ক্রুডের দাম ২৬ শতাংশের বেশি বেড়ে ১১৪ দশমিক ৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ার বাজারগুলোতেও সোমবার সকালে বড় পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৭ শতাংশের বেশি কমেছে, হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ৩ শতাংশের বেশি এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক ৪ শতাংশের বেশি নিচে নেমেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; সোমবার এটি ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যাওয়ায় ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন স্থগিত করা হয়। এই সার্কিট ব্রেকার ব্যবস্থাটি মূলত আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি বন্ধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এর আগে গত বুধবারও কোসপি ১২ শতাংশ পড়ে যাওয়ায় এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছিল।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সরু জলপথ দিয়ে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেরই ধারণা ছিল, এই সপ্তাহে তেলের দাম ১০০ ডলার স্পর্শ করবে। কিন্তু বাস্তবে এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যায় এবং পরবর্তী ১৫ মিনিটে আরও ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

গত সপ্তাহেও বাজার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল।

লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়া কিংবা হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতে অনিচ্ছার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগকারীরা তখন এতটা বিচলিত ছিলেন না।

তবে সপ্তাহান্তের সংঘাত বৃদ্ধি এবং ইরানসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের দৃশ্য বাজারকে দ্রুত আতঙ্কিত করে তুলেছে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে? কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, যদি হরমুজ প্রণালী মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তবে তেলের দাম রেকর্ড ছাড়িয়ে ব্যরল প্রতি ১৫০ ডলারের উপরে চলে যেতে পারে।

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের আদনান মাজারেই বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের লক্ষণের কারণে তেলের দামের এই উল্লম্ফন প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে না।’ তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়ন এখন ‘অবাস্তব’ হয়ে উঠছে।

জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি জেট ফুয়েল এবং সার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মতো অন্যান্য ডেরিভেটিভ বা উপজাত পণ্যের দামও বাড়িয়ে দিতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল-গ্যাস মূলত এশিয়ার দেশগুলোতে সরবরাহ করা হয়। তবে ইতিমধ্যেই এশীয় ক্রেতারা মার্কিন গ্যাসের জন্য উচ্চমূল্য হাঁকাতে শুরু করেছেন। এমনকি ইউরোপের দিকে যাওয়া কিছু গ্যাস ট্যাঙ্কার আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝপথ থেকে ঘুরে যাচ্ছে।

তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করার জন্য এই সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি ‘সামান্য ত্যাগ’ স্বীকার।

এদিকে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রীর রোববার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলই ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র নয়। মূলত যুদ্ধের কারণে নিজ দেশে তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তিনি এই মন্তব্য করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধেয়ে আসছে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’

বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় উল্লম্ফন, ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছুঁইছুঁই

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, হরমুজে শ্বাসরুদ্ধ অর্থনীতি

উৎপাদন-সরবরাহ ভাটা, ১০ এলএনজি ট্যাংকার লিজ দিতে চায় কাতার

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে তেল-গ্যাসের দাম

বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনিসংকেত: দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম

ডলার, বন্ড নাকি সোনা—সংকটের এই সময়ে সম্পদের নিরাপদ আশ্রয় কোনটি

যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে রুশ জ্বালানির চাহিদা

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বিশাল চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র পাবে হাজার কেজি সোনা

চীনে বৃহৎ শোধনাগার বন্ধ, বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে অস্থিরতার শঙ্কা