কৃষি, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে দেশে ৬ হাজার ‘মাইক্রো ইকোনমিক জোন’ বাস্তবায়নের একটি মেগা মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাব দিয়েছে গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর্কিটেকচার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এআরডি)।
আজ রোববার সকাল ১১টায় রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত মিট দ্য প্রেসে এ পরিকল্পনার কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির সিইও ও স্থপতি শামসুন্নাহার মুন্নি।
শামসুন্নাহার মুন্নি বলেন, ৬ হাজার মাইক্রো ইকোনমিক জোন শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। এর মূল লক্ষ্য স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা যতটা সম্ভব স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ করা। এতে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
প্রতিষ্ঠানটির সিইও আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থা, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এআরডি স্থপতি বলেন, ‘আমরা লোকালি এবং গ্লোবালি কাজ করব। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলো স্থানীয়ভাবেই সমাধান করতে পারলে দেশের বড় অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
প্রস্তাবিত মাইক্রো ইকোনমিক জোনে মানুষ শুধু ভোক্তা নয়, উৎপাদক হিসেবেও যুক্ত হবে বলে জানান মুন্নি। তিনি জানান, একজন কৃষকের উৎপাদিত পণ্য অন্য উদ্যোক্তা ব্যবহার করবেন, আবার অন্য উদ্যোক্তার তৈরি পণ্য কৃষক বা স্থানীয় মানুষ ব্যবহার করবেন। এভাবে স্থানীয় কৃষক, কারিগর, উৎপাদক, প্যাকেজিং উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
শামসুন্নাহার মুন্নি বলেন, গ্রামের পুরোনো বিনিময়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাকে আধুনিকভাবে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সক্ষমতা ও বাজারকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। ‘আমরা অন্য কোনো দেশের মতো হতে চাই না। আমরা আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের মতো করে এগোতে চাই।’
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৬ হাজার মাইক্রো ইকোনমিক জোনের আওতায় কোল্ড স্টোরেজ, এয়ারফ্লো স্টোরেজ, অ্যাগ্রো প্রসেসিং সেন্টার, ড্রায়ার ইউনিট ও ফুড প্রসেসিং ইউনিট থাকবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব আবাসন, উদ্যোক্তাদের ওয়ার্ক স্পেস, উৎপাদন সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও ইনকিউবেশন সেন্টার, স্টোরেজ, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাও থাকবে।
শামসুন্নাহার মুন্নি বলেন, এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প নয়; দেশের সবাই মিলে এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। দেশের বড় সমস্যা অর্থের অভাব নয়, বরং বিদ্যমান সম্পদ, দক্ষতা, পণ্য, উদ্যোক্তা ও বাজারকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে না পারা। এই ‘কানেকটিভিটি গ্যাপ’ দূর করাই মাইক্রো ইকোনমিক জোনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন—বাংলাদেশ অরগানিক প্রোডাক্ট অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক নাসীরুল ইসলাম, ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশবিদ মো. মাহমুদুর রহমান পাপন এবং গ্রিন বিল্ডিং অ্যাকাডেমির সভাপতি মো. আল এমরান হোসেন।
আয়োজকদের দাবি, প্রতিটি জোনে গড়ে ১০০ জন উদ্যোক্তা যুক্ত হলে ৬ হাজার জোনে প্রায় ৬ লাখ উদ্যোক্তার একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে। পরিকল্পনায় স্থানীয় সম্পদ ও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ৩৩৩ ধরনের ব্যবসা ও আয়মুখী কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, প্যাকেজিং, ইকো লেদার, ইকো জুতা, পরিবেশবান্ধব প্লেট-কাপ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদনের মতো উদ্যোগ রয়েছে।
তারা জানান, গাজীপুরে করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ফান্ডের মাধ্যমে একটি মডেল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে ২০ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে মডেলটি তৈরি করা হচ্ছে। এর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে প্রকল্পটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা চেয়েছেন আয়োজকেরা। পাশাপাশি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন, গবেষণা, অর্থায়ন কাঠামো এবং আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।