হোম > অর্থনীতি > ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেই প্রথম ত্রৈমাসিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

মূল্যস্ফীতি কমতির দিকে থাকলেও ঝুঁকি কাটেনি, বরং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন পে স্কেল চালুর সম্ভাব্য প্রভাব সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর জরুরি তারল্য সহায়তার সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ ও আমানত নেওয়ার সুদহার স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

আজ বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। এতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর আগে, গত ৩১ জুলাই ২১ মাস পর নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে নীতি সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। একই সভায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি বিবৃতি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেয় মুদ্রানীতি কমিটি। সে অনুযায়ী আজ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম প্রান্তিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির শর্ত ছিল তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে হবে।

ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়াই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তথ্য-উপাত্তভিত্তিক নীতি, লক্ষ্যভিত্তিক ঋণসহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার এবং আর্থিক খাত শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালির সংকট, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দামের সম্ভাব্য সমন্বয় এবং নতুন বেতনকাঠামোর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এই অবস্থায় আগেভাগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমেনি।

এদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন কমে হয়েছে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও দেশি-বিদেশি চাহিদার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ এবং উৎপাদনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতেও ঋণের চাহিদা দুর্বল। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা বিনিয়োগের মন্থর চাহিদা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চঝুঁকি ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করে। গত জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার ও ঋণশৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।

বৈদেশিক খাতে অবশ্য কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের উদ্বৃত্ত ছিল ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে ভিন্নতা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আইএমএফ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তটি মূলত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার একটি সতর্ক কৌশল। বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি বেতন-ভাতা প্রদানসহ বিভিন্ন কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনো অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে—তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এই অবস্থায় তড়িঘড়ি করে নীতি সুদহার বাড়ানো বা কমানোর পরিবর্তে কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতির বাস্তব প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

এই প্রসঙ্গে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও মুদ্রানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকেরা আপাতত একটি ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ অবস্থান নিয়েছেন। এতে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, ঋণের প্রবাহ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বর্তমান নীতির প্রভাব মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।