একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। তবে এই অর্থ ফেরত প্রক্রিয়ায় স্বস্তির পাশাপাশি আমানতকারীদের জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বিশেষ করে মেয়াদপূর্তির আগে এফডিআর ভেঙে একবারে টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতের ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না গ্রাহকেরা। ফলে আমানতের মূল অর্থ ফেরত পেলেও ইতিমধ্যে প্রত্যাশিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি অনেকটা ‘হেয়ার কাট’-এর আদলেই দেখা হচ্ছে।
এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যাংকের তারল্যসংকট ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তার পর নতুন ব্যাংকের মাধ্যমে ধাপে ধাপে আমানত ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানত ফেরতের আবেদন নেওয়া শুরু হয়। ছয় দিনে প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে চাহিদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করেছে।
গতকাল সোমবার থেকে আমানতকারীদের চলতি ও স্থায়ী আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। প্রথম দিনে আমানতকারীরা ভালোভাবেই আমানতের টাকা তুলতে পেরেছেন।
গতকাল আমানতকারীদের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকার। এর বিপরীতে শেষ বেলা পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিয়েছেন গ্রাহকেরা।
আমানত ফেরতের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও এফডিআরধারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। এক্সিট পলিসির আওতায় কেউ যদি তাঁর মেয়াদি আমানত বা এফডিআর ভেঙে একবারে টাকা তুলে নেন, তাহলে সেই আমানতের ওপর মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকছে না। অর্থাৎ একজন গ্রাহক যে হারে মুনাফার প্রত্যাশায় দীর্ঘমেয়াদি আমানত করেছিলেন, মেয়াদপূর্তির আগে পুরো অর্থ তুলে নিলে সেই প্রত্যাশিত মুনাফা আর পাওয়া যাবে না। ফলে মূল আমানত ফেরত পাওয়ার বিনিময়ে ভবিষ্যৎ মুনাফা ত্যাগ করতে হচ্ছে, যা আমানতকারীর দৃষ্টিতে একধরনের আর্থিক ছাড় বা ‘হেয়ার কাট’-এর মতো প্রভাব তৈরি করছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কুমিল্লা শাখার গ্রাহক অবসরপ্রাপ্ত মাহবুব রাব্বানী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এই ব্যাংকে আমার মোট ৫২ লাখ টাকার ১২টি এফডিআর রয়েছে। চাকরিজীবন শেষে যে পেনশন পেয়েছিলাম, তার পুরো টাকাই আমি এই ব্যাংকে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে রেখেছিলাম। সেখান থেকে আমি ৬টি এফডিআরের বিপরীতে ২৩ লাখ টাকার এফডিআর ভাঙাতে আবেদন করেছিলাম। আমার মুনাফাসহ পাওয়ার কথা ছিল ২৮ লাখ টাকা। আজ ব্যাংকে গেলে আমাকে জানানো হয়েছে, ২২ লাখ টাকা অনুমোদন হয়েছে। যেখানে আমি রেখেছিলাম ২৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ মূল টাকা থেকেও কম দিতে চাইছে।’
জানতে চাইলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, মেয়াদপূর্তির আগে এফডিআর ভেঙে আমানত তুলে নিতে চাইলে আমানতকারীকের মুনাফা ছাড়াই মূল টাকা নিতে হবে। তবে তিনি যদি বিশেষ প্রয়োজনে এফডিআরের পুরো টাকা না তুলে অর্ধেক বা যেকোনো অংশ তুলে নেন, তাহলে বাকি টাকা মুনাফাসহ নতুন করে এফডিআর করে রাখতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে তিনি পুরো মুনাফাই পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ‘হেয়ার কাট’ প্রথা বাতিল করে পুরো মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা দেন। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পরেই বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে এক্সিট পলিসি ঘোষণা করেন।
এক্সিট পলিসি অনুযায়ী, সব ধরনের সঞ্চয়ী হিসাবের লেনদেন স্বাভাবিক করা হবে। এর বাইরে অধিকতর প্রয়োজনে যেসব গ্রাহক মেয়াদি আমানত বন্ধ করে ‘এক্সিট’ নিতে চান, তাঁরাও পুরো টাকা তুলতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে কেবল মূল টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আর আবগারি শুল্ক হিসেবে সরকারকে যে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তা ব্যাংক বহন করবে।