হোম > অর্থনীতি

ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য: ৪৮ বাধার সমাধান দিয়ে এফটিএ-আইপিএতে মিলল ইতিবাচক সাড়া

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা

ছবি: সংগৃহীত

প্রায় পাঁচ মাস আগে বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উন্নয়নে শুল্কবহির্ভূত ৬১টি বাধা চিহ্নিত করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কমিশন। সেগুলোর একটি তালিকা ঢাকার কাছে দিয়ে দ্রুত তার সমাধান প্রত্যাশা করেছিল ইইউ কমিশন। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৪৮টির সমাধান দিয়েছে ঢাকা। বাকি বাধাগুলো দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যাশিত পদক্ষেপ পেয়ে ইইউ কমিশনও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রত্যাশিত দুটি দাবি পূরণের অগ্রগতি জানিয়েছে তারা। বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি (আইপিএ) নিয়ে আলোচনায় ইউরোপীয় কমিশনের ইতিবাচক সায় মিলেছে। তার অগ্রগতি চলতি সপ্তাহ থেকে শুরু হতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গতকাল রোববার বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে ২৭ দেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এতে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে বৈঠক শেষে আয়োজিত যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে দুই পক্ষের অগ্রগতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, গত মার্চে ইইউর রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরে। এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে কাজ শুরু করা হয়। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ৪৮টি বাধার সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সমাধান হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা। বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলার করা হয়েছে। রপ্তানি পণ্যের ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতাও দূর করা হয়েছে এবং এর মূল্য নির্ধারণে যৌক্তিকতা আনা হয়েছে। বাকি বাধাগুলো দ্রুত কেটে যাবে। এর ফলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ইইউর অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে হলে ব্যবসার পরিবেশ হতে হবে স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক। সরকারি ক্রয়েও স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পর এফটিএ এবং আইপিএ নিয়ে ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বলে জানান ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেন, সদস্যদেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ হলে চলতি সপ্তাহ থেকে যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য ইউরোপ। বর্তমানে তৈরি পোশাক এই বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। এফটিএ নিয়ে আলোচনা এগোলে পোশাকের পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রও বাড়তে পারে।

গতকালের বৈঠকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগেও ইইউর সমর্থন চেয়েছে ঢাকা। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সুপারিশ ইতিবাচকভাবে এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগামী অধিবেশনে বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উঠবে। তিনি এ ক্ষেত্রে ইইউর সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ ও ইইউর অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিমান চলাচল খাতেও অগ্রগতি চায় দুই পক্ষ। এয়ারবাস কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের চলমান আলোচনা দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইইউ রাষ্ট্রদূত।

ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রভাব নয়, জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাই আমদানি সিদ্ধান্তের ভিত্তি। এলএনজি ও খাদ্যশস্য কেনার ক্ষেত্রে দাম, মান ও অপচয়ের হার বিবেচনা করে সরকারি ক্রয় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়।