দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৫ শতাংশই মন্দ বা আদায় অযোগ্য ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মন্দ ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়। কারণ, এসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে হয়, যা তাদের নিট আয়ে প্রভাব ফেলে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি। শুধু তা-ই নয়, মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক ব্যাংকের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।’ তাঁর মতে, ঋণগুলো যথাযথ নিয়ম মেনে দেওয়া হয়নি। প্রথমত, ব্যাংকের পর্ষদের সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকও সঠিকভাবে তদারকি করেনি।
চলতি বছরের জুন প্রান্তিক শেষে ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬ কোটি টাকাই আদায় অযোগ্য মন্দ মানের শ্রেণীকৃত ঋণে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ শ্রেণীকরণের তিনটি ধাপ রয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত নিম্নমান, ছয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সন্দেহজনক এবং ১২ মাসের বেশি সময় খেলাপি থাকলে তা মন্দ বা আদায় অযোগ্য ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে নিম্নমান ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ মান বা ক্ষতিজনক ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়।
কিন্তু পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বড় অঙ্কের ঋণ নিলেও যোগসাজশের কারণে ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে একদিকে যেমন বড় কোনো জামানত রাখা হয়নি, অন্যদিকে ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোও ওই ঋণের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি জমা করেনি।
অস্বাভাবিক হারে মন্দ ঋণ বৃদ্ধিতে ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণও। জুন প্রান্তিক শেষে ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত থাকায় ব্যাংক খাতের সার্বিক প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। এ সময়ে সর্বোচ্চ প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, যার পরিমাণ ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ইসলামী ব্যাংকে, যার পরিমাণ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন প্রান্তিক শেষে ব্যাংক খাতে মন্দ মানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৯৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৪৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে মন্দ মানের ঋণই রয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৯৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মন্দ ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের, ৭৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এরপর অগ্রণী ব্যাংকে ২৯ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৮ হাজার ৭৫৯ কোটি, সোনালী ব্যাংকে ১৪ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও বাড়ছে মন্দ মানের খেলাপি ঋণ। এসব ব্যাংকের মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৭ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা, যা আলোচ্য সময়ে খেলাপি ঋণের ৯৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এ সময় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, আগের মতোই বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের তিরস্কারের পরিবর্তে পুরস্কৃত করছে। তাঁদের ঋণ পুনঃ তফসিল এবং পুনর্গঠনের সুযোগ দিচ্ছে। এটা আগামী দিনে ব্যাংক খাতে আরও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।’