যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বাণিজ্যযুদ্ধে’ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর দেশেরই সুপ্রিম কোর্ট। আদালত ঘোষণা করেছেন, ট্রাম্পের ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’ সংবিধান পরিপন্থী এবং আইনিভাবে অবৈধ। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর ট্রাম্প সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন।
এই অবস্থায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ট্রাম্প বাণিজ্যচুক্তি করেছেন তাঁর আগের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু আদালত আগের সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন। ট্রাম্পও নতুনভাবে শুল্ক আরোপ করেছেন।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুল্ক নিয়ে চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে- এমন প্রশ্ন যেমন রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তির কী হবে, শুল্ক বাতিল হলেও অন্য শর্তগুলো বহাল থাকবে কি না- এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ভাগ্যের চাবিকাঠিও এখানে। নানা আলোচনা আর দর কষাকষির পর কয়েক দিন আগেই শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ছিল ১৯ শতাংশ। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করায় এবং ট্রাম্প অন্য আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করায় বাংলাদেশের ওপরও শুল্ক এখন এই ১০ শতাংশই। আপাতদৃশ্যে এটা ভালো মনে হলেও অর্থনীতিবিদেরা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
বিবিসি বাংলা জানায়, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ২০২৫ সালের শুরুতেই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য ঢুকলে তার ওপর ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক দিতে হবে। এতে ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমমূল্য কম হলেও মার্কিন শুল্কের কারণে বাংলাদেশি পোশাকের দাম যুক্তরাষ্ট্রে আকাশচুম্বী হয়ে যায়। ফলে ওয়ালমার্ট, গ্যাপ কিংবা এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো বড় বড় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হুমকি দেয়।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বাংলাদেশ পড়ে ৩৫ শতাংশ শুল্কের আওতায়। শেষ পর্যন্ত দর কষাকষি শেষে উভয় পক্ষ বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার ফলে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক দাঁড়ায় ১৯ শতাংশ। বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন এবং অন্তত চারটি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট শুল্ক নিয়ে যে রায় দিয়েছেন, সেখানে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট বা আইইইপিএ ব্যবহার করে শুল্ক বসিয়েছিলেন, সেটি জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে হলেও আসলে ছিল অর্থনৈতিক জবরদস্তি। এই রায়ের ফলে এত দিন ধরে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন যে পাল্টা শুল্ক আরোপের চুক্তি করছিল, সেটি আর কার্যকর থাকছে না।
তবে পিছু হটেননি ট্রাম্প। আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় তিনিও অন্য একটি আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছেন। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা দেশগুলোকে এখন থেকে তাদের পূর্বে আলোচনা করা শুল্ক হারের পরিবর্তে ‘ধারা ১২২’-এর অধীনে ১০ শতাংশ শুল্কের সম্মুখীন হতে হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, শুল্কের বিষয়টি পরিবর্তন হলেও বাণিজ্যচুক্তি বাতিল হচ্ছে না। তাই চুক্তির অধীনে যেসব বিষয়ে সম্মতি বা যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো সব পক্ষ মেনে চলবে বলে আশা করে ট্রাম্প প্রশাসন।
বিশ্ব বাণিজ্যে অন্য দেশের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নয়, বরং কংগ্রেসের হাতেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা। ট্রাম্প যে আইনের ওপর ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেটি মূলত ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনে, যেখানে ট্রাম্পকে এত ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। শুল্ক ইস্যুতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর, এই রায় কার্যকর প্রক্রিয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এ ছাড়া যেসব বড় কোম্পানি ইতিমধ্যে বাড়তি হারে শুল্ক পরিশোধ করেছে তাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না- তা নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা।
নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী এই পথে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে। ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী, ১৫০ দিনের মধ্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে যে সংশ্লিষ্ট দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্যায্য কোনো চর্চা করছে কি না। এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশটির শ্রমবাজার, শ্রমিকের কর্ম-পরিবেশ, বেতন, পরিবেশ দূষণ, নারীদের কর্ম পরিবেশ এসব বিষয়ে অনিয়ম হচ্ছে কি না সেগুলো তদন্ত করবে মার্কিন প্রশাসন।
এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে মার্কিন আইন অনুযায়ী। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশটিকে ঘাটতি থাকা বিষয়গুলো ঠিক করতে আরও ১৫০ দিনের সময় দেওয়া হবে। তবে এই সময় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ক আরোপ বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে কংগ্রেসের শরণাপন্ন হতে হবে। আর যদি কোনো অনিয়ম না পাওয়া যায় তাহলে শুল্ক শূন্যের কোটায় নামিয়ে ফিরতে হবে নিয়মিত বাণিজ্য প্রক্রিয়া বা চুক্তিতে।
বাংলাদেশের কী হবে
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। যদিও দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। দুই দেশের ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বেশি, আমদানি কম। পাল্টা শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতির এই বিষয়টিকে বড় করে সামনে এনেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। চুক্তিতে পৌঁছাতে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান, কৃষিপণ্যসহ নানা পণ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের আগ মুহূর্তে যে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়েছে, সেটি নিয়ে খুশি হতে পারেননি বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ কিংবা ব্যবসায়ীদের কেউই। তাদের মতে, ওই চুক্তিতে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র বেশি লাভবান হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ওপর শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি যে চুক্তি হয়েছে সেটি অসম। আমাদের প্রাপ্তির চেয়ে ক্ষয় বেশি, কঠিন কঠিন শর্ত ওখানে আছে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের ট্যারিফ শুরু থেকেই আনপ্রেডিক্টেবল, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এখন যে ১০ শতাংশ দিয়েছে সেটা আবার কয়দিন থাকে সেটাও তো অনিশ্চিত।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে পুরোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত চুপ থেকে সময় নেওয়া। যে সব শর্তে আমরা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছি সেগুলো নিয়ে এখন আলোচনা করতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য কমানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে।’
ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায় আমাদের জন্য সুখবর। তবে আলোচনার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে, একই সাথে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প এখন যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন এটি ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর মধ্যে মার্কিন প্রশাসন তাদের মতো করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তদন্ত করবে। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে সেগুলো ঠিক করা বা যথাযথ উত্তর নিয়ে প্রস্তুত থাকা।’