প্রতিবছর দেশের শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ। এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিল্পের প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী মিলছে না, আবার শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছে না। অর্থাৎ মানুষের সরবরাহ আছে, কিন্তু ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে তার মিল হচ্ছে না।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের বর্তমান সময়কে ‘উইন্ডো অব অপরচুনিটি’ বা জনমিতিক সুযোগের জানালা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ কর্মক্ষম (১৫-৬৪ বছর) বয়সী। তবে এই সুযোগ স্থায়ী নয়। ইউএনএফপিএর মতে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ পর্যায় অতিক্রম করেছে। এখন দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ না হলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধা অর্থনৈতিক লভ্যাংশে রূপ নেবে না।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের ৪১ শতাংশ তরুণ-তরুণী শিক্ষা, চাকরি বা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের (নিট) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তরুণীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো উৎপাদনশীল অর্থনীতির বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় পরিসংখ্যানেও। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১৯ লাখ হলেও শ্রমশক্তিতে অংশ নিচ্ছেন ৭ কোটি ১৭ লাখ। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছেন।
শিল্পের বাস্তবতাও একই সংকেত দিচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি)-এর শ্রমবাজার বিশ্লেষণ বলছে, ২০২১ সাল থেকেই বিভিন্ন খাতে দক্ষ ও উচ্চদক্ষ কর্মীর চাহিদা বিদ্যমান সরবরাহকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দক্ষতার ঘাটতি প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) কৃষি-খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণ, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া ও পাদুকা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং, তৈরি পোশাক ও জাহাজ নির্মাণসহ ১০টি অগ্রাধিকার খাতে গবেষণা করে গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ দক্ষতার ঘাটতি পেয়েছে। এই দক্ষতার অমিলের বাস্তব চিত্র দেখা যায় চাকরিপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতায়ও। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে আইটি কোর্স শেষ করেও মুন্সিগঞ্জের কাজেম আলী নামের এক তরুণ এখনো চাকরি খুঁজছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রশিক্ষণের পাঠ্যসূচি ও শিল্পের বাস্তব চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শিল্পের চাহিদার সঙ্গে দক্ষ জনবলের সরবরাহের এই ব্যবধান যত বাড়বে, উৎপাদনশীলতা ততই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে মধ্য আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তাই বিশ্বমানের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’
দক্ষতার সংকট শুধু বর্তমান শিল্পের নয়; ভবিষ্যতের অর্থনীতিরও। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি যত বাড়ছে, শ্রমবাজারের চাহিদাও তত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যে দক্ষতা আজ প্রয়োজন, কয়েক বছরের মধ্যেই তার বড় অংশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২২ শতাংশ চাকরির ধরন বদলে যাবে। এআই, বিগ ডেটা, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, রোবটিকস ও সবুজ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে চাহিদা দ্রুত বাড়বে। একই সঙ্গে বিশ্লেষণী সক্ষমতা, সমস্যা সমাধান এবং অভিযোজন দক্ষতার গুরুত্বও বাড়বে।
আইএলওর মতে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা উন্নয়নকে কর্মজীবনজুড়ে চলমান প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার জন্য এটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
দক্ষতার এই ঘাটতি এখন আর কোনো একক শিল্পের সমস্যা নয়। তথ্যপ্রযুক্তি, তৈরি পোশাক, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাতসহ প্রায় সব খাতেই শিল্পের চাহিদার সঙ্গে দক্ষ জনবলের সরবরাহের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ক্লাউড কম্পিউটিং ও সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে দক্ষতা পাঁচ বছর টেকে না। তাই শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী নতুন দক্ষতা অর্জন ও বিদ্যমান দক্ষতার উন্নয়নের একটি জাতীয় ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’
একইভাবে তৈরি পোশাকশিল্পে অটোমেশন, ডিজিটাল উৎপাদন ও উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদনের জন্য দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, সুপারভাইজার ও মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকের চাহিদা বেড়েছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) বলেন, ‘পোশাকশিল্পের পরবর্তী প্রতিযোগিতা প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও মূল্য সংযোজনের। সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ বাড়লেও সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ অপারেটর ও প্রকৌশলীর সংকট রয়েছে। গাজীপুরের একটি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার মালিক জানান, নতুন সিএনসি মেশিন বসানোর পরও দক্ষ অপারেটরের অভাবে একটি শিফট চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে উৎপাদনসক্ষমতা থাকলেও অর্ডারের পুরোটা সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির (বাইশিমাস) সভাপতি মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিল্পভিত্তিক শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ ছাড়া এই ঘাটতি পূরণ হবে না।’
দক্ষতা উন্নয়নে নীতির ঘাটতি নেই; বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন। গত এক দশকে সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, এনএসডিএ, এসইআইপি, এসআইসিআইপি, জাতীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক যোগ্যতা কাঠামো, টিভেট বাস্তবায়ন পরিকল্পনাসহ বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক মানের সনদ, ডিজিটাল দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও আন্তর্জাতিক মানের স্কিল ভেরিফিকেশন, ডিজিটাল স্কিল ব্যাংক, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের উপযোগী দক্ষ জনবল গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, শিল্পের চাহিদা, প্রশিক্ষণের মান এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ। আমাদের লক্ষ্য শুধু কর্মসংস্থান বাড়ানো নয়; এমন দক্ষতা গড়ে তোলা, যা শিল্পের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগের সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা—তিনটিকেই শক্তিশালী করবে।’
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ালেই হবে না; শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও শ্রমবাজারের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। তবে জনমিতিক এ সুযোগ নিজে থেকেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপ নেয় না। এর জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।’
এই বাস্তবতা বিবেচনায় দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে কাজ করছে সরকার। এনএসডিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী বলেন, ‘শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় দক্ষতার মান, প্রশিক্ষণের গুণগত মান এবং শিল্প-একাডেমিয়ার অংশীদারত্ব শক্তিশালী করার কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও সনদব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।’
উন্নয়নের নতুন হিসাব তাই শুধু কত মানুষ কাজ করছে, তার নয়; বরং কতজন বিশ্বমানের দক্ষতায় অর্থনীতির নতুন প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলছে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।