হোম > অর্থনীতি

তৈরি পোশাক খাত: অর্ডার কমছে, সুযোগ নিচ্ছে ভারত

মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা

ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে দীর্ঘদিন ধরে কম খরচে পণ্য তৈরির সবচেয়ে ভরসার জায়গা ছিল বাংলাদেশ। তবে দেশের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি, ক্রমাগত উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, চট্টগ্রাম বন্দরের ধীরগতি এবং দীর্ঘ লিড টাইমের (পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সীমা) মতো সংকটের কারণে বৈশ্বিক ক্রেতারা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন কার্যাদেশের একটি অংশ এখন ভারতের কারখানায় সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতাদের এই বিকল্প পথ খোঁজার প্রবণতা দেশের পোশাক খাতের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পোশাকশিল্প মালিক ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে এখন শুধু কম দামে পণ্য তৈরিই শেষ কথা নয়, সময়মতো বাজারে পণ্য পৌঁছানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাক খাতকে একই সঙ্গে একাধিক অভ্যন্তরীণ সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিপরীতে ভারত সরকারের দেওয়া বিশেষ প্রণোদনা, শক্তিশালী অবকাঠামো, নিজস্ব তুলার বড় উৎস এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ তাদের বাজার আরও মজবুত করছে।

পোশাকশিল্প মালিকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে লিড টাইম। দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন পণ্যের ক্ষেত্রে একটি মৌসুমের পোশাক বাজারে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ দেরি হলে পুরো বিপণন পরিকল্পনা ও বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন এমন দেশের দিকে ঝুঁকছে, যেখানে অর্ডারের পর দ্রুত পণ্য তৈরি করে জাহাজে পাঠানো সম্ভব।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি অর্ডারের পণ্য জাহাজে তুলতে গড়ে ৬০-৯৫ দিন সময় লাগে, যেখানে ভারতে পণ্য তুলতে লাগে ৪৫-৬০ দিন। অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের মধ্যে ভিয়েতনামে লাগে ৬০ দিন এবং চীনে লাগে মাত্র ৩২ দিন। সময়ের এই বড় ব্যবধানই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ভারতসহ অন্য বিকল্প দেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শিল্প মালিকেরা আরও বলছেন, শুধু শিপমেন্টে দীর্ঘসূত্রতাই একমাত্র কারণ নয়। ক্রেতার বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। চলমান জ্বালানিসংকট এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাগুলোতে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদনেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম এবং কারখানা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনের খরচও অস্বাভাবিক বেড়েছে।

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রায় ২৮৬ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০২৪ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রে সব সময় এসব ঝুঁকিপূর্ণ সূচক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং সে অনুযায়ী ক্রয়াদেশে সিদ্ধান্ত নেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য-সংক্রান্ত এমন কিছু পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের কিছু কার্যাদেশ অন্য দেশে চলে গেছে, তার একটি অংশ ভারতেও গেছে। তবে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে ব্যাপকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানিসংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিই এখন শিল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

তবে বিকেএমইএর নেতা এমনটা বললেও গতকাল সোমবার পোশাক খাতের সার্বিক অবস্থা জানাতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। বিজিএমইএ প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতিকে জানায়, গ্যাস-সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় গত তিন বছরে প্রায় চার শ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। তারা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জ্বালানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, ভারত দীর্ঘদিন ধরে পোশাকশিল্পে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করছে। তাঁর ভাষায়, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, কাঁচামালের সহজপ্রাপ্যতা এবং ইউরোপের বাজারকে লক্ষ্য করে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ ভারতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পোশাক তৈরি ও রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বাংলাদেশের সাময়িক দুর্বলতার সুযোগে ভারত নিজেদের সুপরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করেছে। দেশটি প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) কর্মসূচির আওতায় প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল ও কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে হাজার হাজার কোটি রুপির প্রণোদনা দিচ্ছে। একই সঙ্গে পিএম মিত্র প্রকল্পের মাধ্যমে সুতা, কাপড়, রং, পোশাক তৈরি ও লজিস্টিক সুবিধা একই শিল্পাঞ্চলে এনে উৎপাদন সময় ও খরচ অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে। তা ছাড়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তুলা উৎপাদক দেশ হওয়ায় ভারতের নিজস্ব কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থাও বেশ শক্তিশালী। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও আলোচনা অব্যাহত রাখার কারণে ভবিষ্যতে ভারতীয় পোশাক আরও বাড়তি শুল্কসুবিধা পাওয়ার পথ তৈরি হতে যাচ্ছে। তবে এসব তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো এগিয়ে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যা মূলত মূল উৎপাদন সক্ষমতায় নয়; সমস্যা উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, স্থিতিশীলতা ও সময়সীমা নিশ্চিত করতে না পারায়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার স্বীকৃতি বাংলাদেশেই রয়েছে। এ দেশের দক্ষ শ্রমশক্তি ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত বন্দর সেবা, লিড টাইম কমিয়ে আনা এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে এই আধিপত্য ধরে রাখা কঠিন হবে। আজ যে কার্যাদেশের একটি অংশ ভারতমুখী হচ্ছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে তা আরও বড় ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, কারখানা ক্যাপাসিটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে কোম্পানির প্রতি বায়ারদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। সুতরাং সরকারের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বিকল্পব্যবস্থা করতে হবে।

জানতে চাইলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো পরিচালক (নীতি পরিকল্পনা বিভাগ) আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে কিছু বায়ারের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে লিড টাইমে পণ্যপ্রাপ্তি নিয়ে। এ ছাড়াও এলডিসি-পরবর্তী ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পক্ষান্তরে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করেছে। ফলে স্থিতিশীলতার খাতিরে কিছু বায়ার চলে যাচ্ছে।

আবু মোখলেছ অবশ্য দাবি করেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করব, বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করছি, মার্কেটে তার প্রভাব পড়বে না।’