সারা পৃথিবীতে বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে। এক সময় পৃথিবীতে দাস ব্যবসা ছিল, সেই অতীত নিয়ে মানুষ যেমন এখন লজ্জিত হয়; তেমনি এক সময় বর্তমানের মাত্রাছাড়া বৈষম্য নিয়ে মানুষ লজ্জিত হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু।
অর্থনীতির অগ্রগতি ও মানুষের কল্যাণের পুরো চিত্র শুধু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) দিয়ে বোঝা যায় না। স্বাস্থ্য, শিক্ষার মান, পুষ্টি, বৈষম্য, সম্পদের মালিকানা ও অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের মতো বিষয়ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্মৃতি গবেষণা সম্মেলন ২০২৬’–এ মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক কৌশিক বসু।
বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন ও সাজেদা ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। ‘ন্যায্যতা, সক্ষমতা ও জীবনকুশলতা’ শিরোনামে সম্মেলনের এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। স্বাগত বক্তব্য দেন বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ চৌধুরী। সূচনা বক্তব্য দেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান ও ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষণা উপদেষ্টা সাজেদা আমিন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি সমাজের বিকাশের একমাত্র ভিত্তি নয়। চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন, সমালোচনামূলক জনপরিসর, যুক্তিবোধ ও শিক্ষাগত সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েও সমাজ বিকশিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চ্যুয়ালি এই সম্মেলনে যুক্ত হন কৌশিক বসু। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এখন মানুষের কণ্ঠস্বরের বৈষম্যেও রূপ নিচ্ছে। অতিধনী ব্যক্তিরা সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম কিনতে পারায় জনপরিসরে তাঁদের প্রভাব বাড়ছে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতা ও মানুষের কল্যাণ পরিমাপের জন্য জিডিপির পাশাপাশি আরও বিস্তৃত সূচক প্রয়োজন।
কৌশিক বসু বলেন, অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতা ও মানুষের কল্যাণ পরিমাপের জন্য তাঁর মডেলে ২১টি সূচক রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মান, শিক্ষার মান ও বিস্তার, পুষ্টি, বৈষম্য এবং সম্পদের মালিকানা বিস্তারের মতো বিষয় এসব সূচকের মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক সুযোগকে আরও বিস্তৃত করতে মালিকানার সুযোগ সমাজের বৃহত্তর অংশের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে রেনাটা ও সাজিদা ফাউন্ডেশনের মালিকানা কাঠামোর উদাহরণ দেন কৌশিক বসু। তিনি বলেন, করপোরেট খাতে শ্রমিকসহ সমাজের বৃহত্তর অংশের মালিকানার সুযোগ তৈরি করা অর্থনৈতিক সুযোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে করপোরেট মালিকানার নতুন মডেল প্রয়োজন। এমন একটি মডেল নিতে হবে, যেখানে করপোরেট খাতের মালিকানায় শ্রমিকদেরও অংশীদারত্ব থাকবে। সমাজে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে বিপুল পরিমাণে সম্পদ। বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী, অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে। নীতিগত বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। তিনি আরও বলেন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) নামে শুধু লোকদেখানো কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানার একটি অংশ এমন একটি ফাউন্ডেশনের জন্য নির্ধারণ করতে হবে, যা জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য স্থায়ী ও টেকসই অর্থের উৎস হিসেবে কাজ করবে। এই মডেলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সক্ষমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। সবার জন্য মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আলোচনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন কার্যকর রাখতে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পাশাপাশি সুশাসন, মূল্যবোধ ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। তিনি বলেন, সমতা, ন্যায়বিচার এবং পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে থাকা দরকার।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা কঠিন হলেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বাইরে থেকেও জবাবদিহির দাবি তোলা প্রয়োজন।
সাজিদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহান বলেন, প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব, জবাবদিহি, মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা এবং ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো সমন্বিত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি সরকার ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সরকারের কাছে সব জ্ঞান বা সমাধান থাকে না, তাই ‘পুরো সরকার’ এবং ‘পুরো সমাজকে’ নিয়ে কাজ করার পদ্ধতি প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেন, সাজিদা ফাউন্ডেশনের কাজের মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য, মানুষের জীবিকা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো যুক্ত। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পাশাপাশি পর্যাপ্ত সরকারি সম্পদ প্রয়োজন।
তিনি বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম। এই অনুপাত বাড়াতে পারলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও বেশি সম্পদ দেওয়া সম্ভব হবে। শিক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার মান একইভাবে বাড়েনি। শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সাজিদা ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ও লিন্ডে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচালক শেহজাদ মুনিম বলেন, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠানের জন্য উত্তরসূরি তৈরির পরিকল্পনা এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ ও নীতিগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চার করা গুরুত্বপূর্ণ।
সাজিদা ফাউন্ডেশনের মূল্যবোধ, উদ্দেশ্য ও নীতিমালা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব ধীরে ধীরে পেশাদার ব্যবস্থাপনার কাছে হস্তান্তর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিভা ব্যবস্থাপনার কাঠামো আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে।
সাজিদা ফাউন্ডেশন ও রেনাটার সম্পর্কের প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেন ভিডিও বার্তায় বলেন, বিদেশি মালিকানার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে সরে যাওয়ার সময় স্থানীয় শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মালিকানা হস্তান্তরের জন্য চুক্তি প্রণয়নে তিনি যুক্ত ছিলেন। পরে প্রতিষ্ঠানটি রেনাটা লিমিটেড নামে পরিচিত হয় এবং সাজিদা ফাউন্ডেশন ৫১ শতাংশ শেয়ার ধারণ করে। সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ব্যবসার কাঠামোর মধ্যেই যুক্ত করার লক্ষ্য ছিল এই ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সাজিদা ফাউন্ডেশনের উত্তরণ কর্মসূচি নিয়ে ১১ হাজার দরিদ্র পরিবারের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের আয়ের উৎসে বৈচিত্র্য ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অগ্রগতি হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এখনো কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।