দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে শুধু সহজ শর্তে ঋণ নিতে চায় না বাংলাদেশ। দেশটির বড় বিনিয়োগ তহবিল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি কোম্পানির অর্থও দেশে আনতে চায় সরকার। এ জন্য অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও শিল্প খাতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশ। সম্ভাব্য ১০০ থেকে ২০০ কোটি ডলারের একটি সার্বভৌম তহবিল গঠনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ঋণনির্ভর সহযোগিতা থেকে বিনিয়োগ ও ব্যবসাভিত্তিক অংশীদারত্বে নিতে চায় বাংলাদেশ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকারি সফরের দ্বিতীয় কর্মদিবসে এসব বিষয়ে আলোচনা করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়, কোরিয়া এক্সিম ব্যাংক (কেএক্সিম), কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (কেআইসি), বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করে তারা।
কেএক্সিমের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোয়াং কিয়নের সঙ্গে বৈঠকে ২০২৩-২০২৭ মেয়াদের ৩০০ কোটি ডলারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এই তহবিলের আওতায় কোন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা পর্যালোচনা করছে কোরীয় পক্ষ। আলোচনায় ঢাকার এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণ রুট, মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী রেলকোচ কেনার প্রকল্পের কথা উঠে আসে। এসব প্রকল্পের প্রস্তাব কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিবেচনার জন্য পাঠানো হবে বলে জানায় কেএক্সিম। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অবশিষ্ট ঋণের অর্থ কোন কোন প্রকল্পে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে দ্রুত একটি পরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তবে সহযোগিতা শুধু ঋণ ও অবকাঠামো প্রকল্পে সীমিত রাখতে চায় না বাংলাদেশ। এআই, ডিজিটাল সেবা, স্মার্ট অবকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম সরবরাহব্যবস্থা গড়তেও কোরিয়ার প্রযুক্তি ও সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কোরিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে কেআইসির সঙ্গে বৈঠকে। এই প্রতিষ্ঠান কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল পরিচালনা করে। বাংলাদেশের অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো খাতে তাদের বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় ১০০ থেকে ২০০ কোটি ডলারের একটি বাংলাদেশ সার্বভৌম তহবিল গঠনের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এ ধরনের তহবিলের মাধ্যমে বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব। পাশাপাশি কোরিয়ার ফান্ড ম্যানেজারদের মাধ্যমে কেআইসির ইকুইটি বিনিয়োগের সঙ্গে কেএক্সিমের অর্থায়ন যুক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনা হয়। অর্থাৎ, কোনো প্রকল্পে শুধু ঋণ নয়, বিনিয়োগের অংশীদার হিসেবেও কোরীয় প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে চায় বাংলাদেশ।
কোরিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও এআই নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী নিজস্ব বৃহৎ ভাষাভিত্তিক এআই মডেল তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প উৎপাদন ও সরকারি সেবায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এআই ও ডেটা সেন্টার হাব হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহ জানানো হয়। ফুরিওসাএআইয়ের সঙ্গে আলোচনায় এআই প্রযুক্তির দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এদিকে স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে অবকাঠামো, সৌরবিদ্যুৎ, নগর উন্নয়ন, পর্যটন ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করে প্রতিনিধিদল। প্রতিষ্ঠানটি শুধু প্রকল্প নির্মাণের ঠিকাদার হিসেবে নয়, দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগকারী হিসেবেও কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়ে কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে। কোরীয় কোম্পানি ইয়ংওয়ানের আয়োজিত ব্যবসায়িক বৈঠকে হালকা প্রকৌশল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে কোরিয়ার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং তাদের সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।