হোম > অর্থনীতি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন: অতি ধনীদের আমানত কমে বাড়ছে ছোট ও মাঝারিদের

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা

ফাইল ছবি

দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অতি ধনী আমানতকারীদের বড় অঙ্কের হিসাব কমে গেলেও ছোট ও মাঝারি আমানতকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

ব্যাংক খাতের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ২২টি, চলতি বছরের মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫টিতে। একই সময়ে এমন আমানতকারীদের আমানতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিপরীতে ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার আমানতকারীদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে, তেমনি বেড়েছে তাঁদের আমানতের পরিমাণও।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বড় আমানতকারীদের দ্রুত সরে যাওয়া ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ বড় আমানতকারীরা ব্যাংকের জন্য তুলনামূলক কম খরচের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থের উৎস। ব্যাংক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে সাধারণ মানুষের বাড়তে থাকা আস্থা ধরে রাখা, অন্যদিকে বড় আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সরকার পরিবর্তনের পর সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। কেউ কেউ সম্ভাব্য তদন্ত বা জবাবদিহির ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ ব্যাংক হিসাবের ধরন পরিবর্তন করছেন। তারা একই ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা না রেখে বিভিন্ন ব্যাংকে ছোট ছোট আমানত রাখতে পারেন। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা রাখা গ্রাহকেরা এখন ঝুঁকি কমাতে অর্থ ভাগ করে রাখছেন বা বিকল্প বিনিয়োগের দিকে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েক বছর আগেও ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধির বড় অংশ আসত উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও করপোরেট গ্রাহকদের কাছ থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বড় অঙ্কের আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে, কোথাও কোথাও তা বেশ কিছুটা কমেছে। বিপরীতে ছোট আমানতধারীর সংখ্যা এবং তাঁদের মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় সম্পদের মালিকেরা ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্তের সঞ্চয় প্রবণতা বাড়ছে।

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বড় আমানতকারীদের এই সরে যাওয়া মূলত রাজনৈতিক পরিবর্তন, ব্যাংক খাতের নানা ধরনের অনিয়মের প্রকাশ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে হয়েছে। অনেক ধনী ব্যক্তি আবার বড় অঙ্কের অর্থ এক জায়গায় না রেখে বিভিন্ন ব্যাংক, বিকল্প বিনিয়োগ, বিদেশি সম্পদ বা অন্যান্য খাতে স্থানান্তর করছেন।

বাড়ছে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়

চাকরিজীবী, প্রবাসী পরিবার এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে যেখানে বড় কয়েকটি হিসাবের ওপর ব্যাংক বেশি নির্ভর করত, এখন হাজার হাজার ছোট হিসাব থেকেই উল্লেখযোগ্য আমানত আসছে। মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পে অংশগ্রহণও বেড়েছে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় ২০২৬ সালের মার্চে একেবারে ছোট থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই তাঁদের আমানতের পরিমাণও বেড়েছে।

২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকে একেবারে সর্বনিম্ন স্তর থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৪৮ লাখ। তাঁদের জমা আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। গত মার্চে এমন আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৮৮ লাখে। আমানত বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ১ কোটি ৪০টি এবং আমানত বেড়েছে ১২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

একইভাবে, ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকে ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীদের হিসাব ছিল ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার। এসব হিসাবে জমা ছিল ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে এ ধরনের আমানতকারীদের হিসাব সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ১২ হাজার। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানতকারী বেড়েছে ১৭ লাখ ২৭ হাজার এবং জমা অর্থ বেড়েছে ৯৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা ব্যংকে মোট আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ এই শ্রেণির আমানতকারীদেরই ব্যাংক হিসাব মোট আমানতের অর্ধেকের বেশি রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যবিত্তের সঞ্চয় বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারণ এটি মানুষের আর্থিক শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। তবে বড় অঙ্কের আমানত কমে গেলে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার সক্ষমতায় কিছুটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে শিল্প ও অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ কঠিন হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষ ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত সঞ্চয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এই সঞ্চয়ে সব সময়ই মধ্যবিত্তরা এগিয়ে থাকেন।

শ্রেণিভেদে আমানতকারী এবং আমানতের পরিমাণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার। তাঁদের জমা আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে এমন আমানতকারীর হিসাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার। আর আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ৫৯ হাজার এবং জমা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ২১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জমা আমানতকারীর সংখ্যা ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার। ওই সময়ে তাঁদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে আমানতকারীর হিসাব সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার। তাঁদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে আমানতকারী বেড়েছে ১৯ হাজার এবং জমা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ১৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

১ কোটি টাকা থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানতকারীর হিসাব ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ৩৫ হাজার ৫টি। এসব হিসাবে জমা অর্থ ছিল ৭৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে এমন আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৫২টিতে। তাঁদের হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর অর্থ, আমানতকারীর হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৪৭টি এবং জমা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

২৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার হিসাবধারী আমানতকারী ২০২৫ সালের মার্চে ছিল ৭৬ জন। এসব হিসাবে জমা ছিল ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে এমন আমানতকারীদের হিসাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৩টিতে। জমা অর্থের পরিমাণও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। এক বছরে আমানতকারী বেড়েছে ২৭ জন এবং জমা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

নিরাপদ ফল: মধুপুরের আনারস যাচ্ছে বিদেশে

‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে আইএফআইসি ব্যাংকের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত

টানা দুই দফা বৃদ্ধির পর সোনার দাম কমল ৩৩২৪ টাকা

বিনিয়োগ পাইপলাইন থেকে এসেছে ৪০ কোটি ডলার

সমন্বিত মহাপরিকল্পনা: প্রবৃদ্ধির নতুন কেন্দ্র কক্সবাজার

বাংলাদেশ ব্যাংক: ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ৪২% খেলাপি

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়তে মাস্টারপ্ল্যানের উদ্যোগ

জনতা ব্যাংকের ৮৯৫তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত

সাউথইস্ট ব্যাংকের ইজিএম ও এজিএম অনুষ্ঠিত

মিরপুরে নতুন গ্রামীণফোন সেন্টার চালু