মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। অনেক বেড়ে গেছে জ্বালানির দাম। এর সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন খরচ ও আমদানি ব্যয়। প্রায় চার মাস পরে এসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হওয়ায় মিলেছে স্বস্তি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে গেছে। এতে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, উৎপাদন ও পরিবহন খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমতে পারে। এতে নতুন সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন সহজ হবে, কমবে আমদানি ব্যয়, রিজার্ভের চাপ, ডলারের চাহিদা ও মূল্যস্ফীতি। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে গতি আসতে পারে।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং এলএনজির বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। কাতার থেকে বাংলাদেশে আমদানি হওয়া প্রায় সব এলএনজিই এই পথ ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা জ্বালানি তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও শিল্প কাঁচামালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দ্রুত বাড়ে। এলএনজির স্পট মার্কেটেও অস্থিরতা দেখা দেয়। পাশাপাশি জাহাজের যুদ্ধঝুঁকি বিমা প্রিমিয়াম বাড়তে শুরু করে। ফলে পণ্যের দাম ও পরিবহন ব্যয়—দুইই বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ১০ ডলার বাড়লে দেশের বার্ষিক আমদানি ব্যয় ১ থেকে ১.২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়ে। এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২ থেকে ৩ ডলার বাড়লে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক শ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু জ্বালানি খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। এখন সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা কমে আসবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে জ্বালানি ও সার আমদানির জন্য প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম ১০-১৫ শতাংশ কমে এলে সরকারের জ্বালানি আমদানিতে বছরে সেই কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ভর্তুকির চাপও কমবে। অর্থাৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা তুলনামূলক সহজ হবে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডলারের সংকট। জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় মানেই রিজার্ভ থেকে বেশি ডলার বের হয়ে যাওয়া। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল, এলএনজি ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই ঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানি মূল্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনশীল উপাদানগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে ডলারের চাহিদা কমবে, রিজার্ভ সংরক্ষণ সহজ হবে এবং বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে।’ তাঁর মতে, আমদানি ব্যয় ৩-৪ বিলিয়ন ডলার কমে এলে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। পরিবহন, উৎপাদন ও কৃষি ব্যয় বাড়ে, বাড়ে পণ্যের দামও।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, মূল্যস্ফীতির বড় অংশ এখন কস্ট-পুশ বা ব্যয়জনিত। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কমতে শুরু করলে তার ইতিবাচক প্রভাব পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়বে। খাদ্যপণ্য থেকে শিল্পপণ্য পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই চাপ কমবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল থাকলে আগামী এক বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির ওপর ১ থেকে ১.৫ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল আমদানি ব্যয় ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছিল। ব্যবসায়ী নেতা তাসকীন আহমেদ মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অনেক বিনিয়োগ প্রকল্প পিছিয়ে যেত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরবে এবং নতুন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। তাঁর মতে, উৎপাদন ব্যয় কমলে শিল্প খাতের সক্ষমতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, আমদানি কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। শিপিং ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য ও জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘উৎপাদন ব্যয় কমলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারব। এতে নতুন অর্ডার আসবে এবং রপ্তানি আয় বাড়বে।’