হোম > অর্থনীতি

বদলাচ্ছে হিসাবের পদ্ধতি: জিডিপিতে আসছে ছোট-বড় সব খাত

মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা

এক দশক আগেও যে অর্থনীতির বড় অংশের হিসাব করা হতো কারখানা, দোকান, কৃষি ও প্রচলিত সেবার মাধ্যমে, এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, অ্যাপভিত্তিক যাতায়াত, মোবাইল ফোনে আর্থিক লেনদেন, অনলাইনে কাজ করে আয় কিংবা ফুটপাতে ছোট ব্যবসা—সবই এখন মানুষের আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ।

এই পরিবর্তন এবার জাতীয় হিসাবেও আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি পরিমাপের ভিত্তি বছর পাল্টানোর কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এর অংশ হিসেবে অর্থনীতির নতুন ও দ্রুত বেড়ে ওঠা কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহের পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে।

বর্তমানে স্থির মূল্যে জিডিপি হিসাবের ভিত্তি বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছর। গত এক দশকে অর্থনীতির কাঠামো ও মানুষের আয়-ব্যয়ের ধরন বদলে যাওয়ায় ২০২১-২২ অর্থবছরকে নতুন ভিত্তি বছর করার বিষয়টি বিবেচনা করছে বিবিএস। এতে বাস্তব কর্মকাণ্ডের পরিধি ও পরিবর্তনের গতি পরিসংখ্যানে আরও পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হবে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এ বিষয়ে বিবিএস মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শামীমুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জিডিপির ভিত্তি বছর পরিবর্তনে ইতিমধ্যেই একাধিক টিম কাজ করছে। আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যে কাজটি শেষ করা সম্ভব হবে।’

অর্থনীতির নতুন কর্মকাণ্ড

নতুন ভিত্তি বছরে রাইড শেয়ারিং, ই-কমার্স, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সোলার প্যানেল ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো কর্মকাণ্ড আরও ভালোভাবে হিসাবের আওতায় আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব খাতে নতুন সেবা, আয় ও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। অ্যাপভিত্তিক পরিবহন এখন অনেক মানুষের আয়ের উৎস; অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা তৈরি করেছে নতুন উদ্যোক্তা।

পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিনির্ভর খাতে নয়। ফেরি করা, নিজস্ব রিকশা, ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, ইজিবাইক বা অন্যান্য যানবাহন চালানো এবং রাস্তা বা ফুটপাতে দোকানদারির মতো ছোট কর্মকাণ্ডেও বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এ বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি খানাভিত্তিক এবং খানার বাইরে পরিচালিত এসব আয়মূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

শুমারিতে খামারভিত্তিক গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মৎস্য ও নার্সারির মতো কৃষি প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে অর্থনীতির হিসাব এখন শুধু বড় শিল্প বা আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ের কর্মকাণ্ডও দৃশ্যমান হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির হিসাবেও প্রশ্ন

জিডিপির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির হিসাবও সময়োপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিবিএস ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআইয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি হিসাব করে। নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবার একটি ঝুড়ি এবং বিভিন্ন বাজারের দাম এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

বর্তমানে মূল্যস্ফীতির তথ্য সংগ্রহে ১৫৪টি বাজার এবং ৭০০টির কিছু বেশি পণ্যের দাম নেওয়া হয়। কিন্তু মানুষের ভোগের ধরন ও বাজারব্যবস্থা বদলেছে। নতুন পণ্য ও সেবা এসেছে, বদলেছে ব্যয়ের ধরনও। তাই এই নমুনা বর্তমান বাস্তবতাকে কতটা প্রতিনিধিত্ব করছে, তা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, জিডিপি বা মূল্যস্ফীতি—যে ক্ষেত্রেই হোক, ভিত্তি পরিবর্তনের পাশাপাশি হিসাবের ভিত্তি ও মানদণ্ডও যাচাই করতে হবে। নমুনার আকার বাড়ানো এবং তা যথেষ্ট প্রতিনিধিত্বশীল কি না, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।

নির্ভুল হিসাবই বড় বিষয়

জিডিপির সঠিক হিসাব বাজেট, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভিত্তি বছর চালু হলে অর্থনীতির নতুন ও দ্রুত বেড়ে ওঠা খাতগুলো আরও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ইজিবাইকচালক, ফুটপাতের দোকানি বা ফেরিওয়ালার মতো ছোট কর্মকাণ্ডের তথ্যও জাতীয় অর্থনীতির চিত্রকে আরও বিস্তৃত করবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভিত্তি বছর সাধারণত একটি স্থিতিশীল বছরকে ধরা হয়। সে হিসেবে উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে ভিত্তি বছরের তথ্য-উপাত্ত বাস্তবভিত্তিক হতে হবে এবং তার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।