বাংলাদেশের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে দুটি যৌথ ব্যবসায়িক টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই)। এর একটি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন নিয়ে কাজ করবে; অন্যটি ডিজিটাল রূপান্তর ও উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় দেখবে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ঢাকা সফররত সিআইআইয়ের উচ্চ- পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনা, ভিসা জটিলতা এবং বিদ্যমান বাণিজ্য বাধা ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিতে বড় ধরনের অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন। নতুন রেলপথ, মহাসড়ক, বন্দর, এলএনজি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থায়ন দরকার। এসব ক্ষেত্রে ভারতীয় বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হলে তা ইতিবাচকভাবে দেখা হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘সাশ্রয়ী ভারতীয় বিনিয়োগ এলে তা আমাদের অর্থনীতির জন্যই সুফল বয়ে আনবে। আমার মনে হয়, টাস্কফোর্স গঠন একটি ভালো প্রস্তাব।’
প্রস্তাবিত টাস্কফোর্স দুটির মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে। ডিজিটাল সহযোগিতার আওতায় সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ ও ডেটা সেন্টারের মতো ভবিষ্যৎমুখী খাতেও কাজ করার আগ্রহ জানিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এ উদ্যোগ নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের সমস্যা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে বেনাপোল বন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং আরও দ্রুত ও দক্ষ করার তাগিদ দেন তাঁরা। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সীমান্তে পণ্য চলাচলের প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে পরিবহন ও কাঁচামালের ব্যয় কমবে। এতে দুই দেশের বাণিজ্যও বাড়বে।
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্য বিধিনিষেধ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্যকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিবন্ধকতা দূর করা প্রয়োজন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী বলেন, ভিসা সহজ করা এবং বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের নিয়মিত যাতায়াতের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ভিসার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশে দ্রুত বাড়তে থাকা ভোগ্য ও ব্যবহার্য পণ্য খাতেও বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে সিআইআই। এ জন্য ঢাকার আশপাশে সাবান, গৃহস্থালি পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা।
এ ছাড়া শিল্পে জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে শুল্ককাঠামো সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। সিআইআই প্রতিনিধিরা জানান, তাঁদের স্টিম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে বস্ত্র, তৈরি পোশাক ও খাদ্যশিল্পে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে শুল্ক বৈষম্যের কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অনিবন্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বৈঠকে তুলে ধরেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় দেশে কাজের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা কমাতে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারে পার্থক্য থাকলেও ভৌগোলিক অবস্থান পারস্পরিক সহযোগিতার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এদিকে একই দিনে রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে সিআইআই ও এফবিসিসিআই নেতাদের বৈঠক হয়েছে। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সংলাপ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয় দুই পক্ষ। প্রস্তাবিত যৌথ টাস্কফোর্সের কাঠামো ও কাজ ঠিক করতে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বিনিময়ের বিষয়েও তারা সম্মত হয়।
সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি বলেন, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ বাড়লে পারস্পরিক আস্থাও বাড়বে। বাংলাদেশে ব্যবসা করা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা ইতিবাচক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, বৈঠকে বাণিজ্যের অশুল্ক বাধা ও ভিসা জটিলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অবকাঠামো খাতে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জ্বালানি খাতের বাইরে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।