চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড) গড়ে তুলতে প্রায় ৪ হাজার ১৯০ কোটি টাকার অবকাঠামো প্রকল্পে একের পর এক অসংগতি ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। একই প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও ডেভেলপার হিসেবে যুক্ত থাকা, প্রকল্প অনুমোদনের আগেই দরপত্র মূল্যায়ন এবং কয়েকটি অবকাঠামো খাতে ‘অস্বাভাবিক’ ব্যয়—এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। তবে আপত্তিগুলোর পূর্ণ নিষ্পত্তি ছাড়াই প্রকল্পটি আজ মঙ্গলবার একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)’ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, বেশ কিছু শর্ত সাপেক্ষে প্রকল্পটি একনেকে উত্থাপন করা হচ্ছে। সরকার বিষয়টি দেখভাল করবে।
পিইসি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, প্রথম প্রস্তাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। পরে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে তা কমে ৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকায় এলেও সর্বশেষ প্রস্তাবে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রথম প্রস্তাবের তুলনায়ও ব্যয় বেড়েছে ১৩৩ কোটির বেশি। তবে কোন খাতে কত ব্যয় বেড়েছে, তার বিস্তারিত তুলনামূলক হিসাব ডিপিপিতে সংযুক্ত না থাকায় আপত্তি তোলে পরিকল্পনা কমিশন। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রথম ডিপিপি ও সংশোধিত ডিপিপির ব্যয়কাঠামোর তুলনামূলক বিবরণী জমা দিতে বলা হয়েছে।
সভায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) ঘিরে। প্রতিষ্ঠানটি একদিকে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে, অন্যদিকে একই প্রকল্পের ডেভেলপার হিসেবেও মনোনয়ন পেয়েছে।
শিল্প ও শক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী সম্ভাব্যতা সমীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান একই প্রকল্পে ঠিকাদার বা ডেভেলপার হতে পারে না। এ বিষয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনসংক্রান্ত নথি ডিপিপির সঙ্গে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প অনুমোদনের আগেই কীভাবে দরপত্র নথি ইস্যু ও মূল্যায়ন সম্পন্ন হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পিইসি। বেজা কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের আগস্টে সিআরবিসিকে বিড ডকুমেন্ট দেওয়া হয় এবং পরে তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। কমিশনের প্রশ্ন, প্রকল্প অনুমোদনের আগেই এমন প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয়বিধির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রকল্পের কয়েকটি অবকাঠামো উপাদানের ব্যয় নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে পিইসি। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ৩৩০ মিটার সেতুসহ ১ হাজার ২৩৫ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১ হাজার ১৮১ মিটার আরেকটি সড়কের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা। দুটি জলাধার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৭ কোটির বেশি। এসব ব্যয়কে ‘অত্যধিক’ উল্লেখ করে পরিকল্পনা কমিশন এর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে বলেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথম পিইসি সভার পর কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ডিপিপি সংশোধন করতে প্রায় আট মাস সময় লাগে। এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণও জানতে চেয়েছে কমিশন।
তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। শিল্পাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণেই এই অর্থ ব্যয় হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে পিইসি প্রকল্পটিকে শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। কমিশনের আপত্তি ও প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি না হলেও প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।
একনেক সভায় এই প্রকল্প ছাড়াও আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন, সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণসহ আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।