নিরুপায় হওয়ার যুক্তি দিয়ে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গণপরিবহন খাতসহ প্রত্যক্ষভাবে জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী নাগরিক সমাজের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে এতে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পেট্রলপাম্পে সীমিত থাকে না। সব ধরনের পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চাপ সৃষ্টি করে।
ইতিমধ্যেই সরকারি কর্মচারীদের বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধির প্রভাবে দ্রব্যমূল্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম এতটা বাড়ানোর ফলে নিত্যপণ্যের দাম তথা জীবনযাত্রার সামগ্রিক খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে নির্ধারিত আয়ের মানুষ। আয় একই হারে না বাড়লে কমে যেতে পারে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেই জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। গণপরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ায় বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চলাচলের ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের পরিবহন ও সরবরাহ-ব্যবস্থায়। ডিজেলচালিত সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল কৃষকের খরচ বাড়লে তার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। একইভাবে শিল্পকারখানার জেনারেটর, পরিবহন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতির পরিচালন ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে স্থানান্তর করলে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসার খরচ বাড়বে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে চাল, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ।
ফাহমিদা খাতুন সরকারকে পরিবহন ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, বাজার তদারকি এবং দরিদ্র পরিবার, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ওপর কর ও অন্যান্য ব্যয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
গত রোববার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার, যা সেদিন মধ্যরাতের পর থেকেই কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা।
এদিকে গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮ ডলার কমেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় এক হাজার টাকা। এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হচ্ছে ১৫৯ লিটার। কয়েক বছর ধরে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে মাসওয়ারিভাবে জ্বালানির দাম কমানো-বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করে আসছিল। তবে এবার মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকার সাম্প্রতিককালের ভর্তুকির বোঝা কমানোর যুক্তি দিয়েছে।
বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সাত মাসে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম তিন দফায় ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরকার প্রথম থেকেই মূল্যস্ফীতি কমানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলে আসছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামেনি। সবশেষ আগস্টের শেষে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম এক দফায় বড় হারে বাড়ানো হয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম ৮০ টাকা থেকে ১১৪, পেট্রল ৮৬ থেকে ১৩০ এবং অকটেন ৮৯ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ের ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে আগস্টে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে ওঠে। তবে ওই সময় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে জ্বালানির দাম ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া, ডলার-সংকটসহ বিভিন্ন কারণ ছিল।
বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ভর্তুকির বোঝা ও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাজারের দামের বিষয়টি সামনে এসেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলেছে, কয়েক মাস ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়া থাকায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং লোকসানের কারণে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দল ও অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ জ্বালানি খাতের ব্যয়, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, কর-শুল্ক ও ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তকে অপরিণামদর্শী আখ্যা দিয়েছেন ভোক্তার স্বার্থ-বিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সময় সরকার দাম বাড়াল। তাড়াহুড়া না করে আরও কিছুদিন বাজার পর্যবেক্ষণ করা উচিত ছিল। ১৮ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। বাড়তি দায় মেটাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে তা সমন্বয় করতে চাইলে এর প্রভাব পড়বে ১৮ কোটি মানুষের ওপর।’
বিপিসিকে বর্তমানে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে এস এম নাজের হোসাইন বলেন, তেলের দাম না বাড়িয়ে বিপিসির সিস্টেম লস, অনিয়ম ও দুর্নীতি কমানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘গরিবের তেল’ হিসেবে পরিচিত ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর আরও চাপ বাড়বে। পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচও বাড়বে। তাঁর মতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ার মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এ পরিণত হবে।
তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকারের অন্য কোনো বিকল্প নেই। সরকারকে হয় ভর্তুকি দিতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে, অথবা ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হবে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে যেন অন্যান্য পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি থেকে সরে আসার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হলেও সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক, পরিবহনশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সীমিত আয়ের মধ্যবিত্তের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।