ঘরে রাখা নগদ টাকার প্রবাহে এবার উল্টো স্রোত দেখা দিয়েছে। জুনে এক মাসের ব্যবধানে মানুষের হাতে থাকা নগদ কমেছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
একই সময়ে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দুই পরিসংখ্যানে মিলছে অর্থের গতিপথ বদলের ইঙ্গিত। ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশ আবার ব্যাংকে ফিরছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। মে মাসে ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ কমেছে ১২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।
তবে গত বছরের জুনের তুলনায় এবারও মানুষের হাতে নগদ অর্থ ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। গত বছরের জুনে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। মে মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ এক মাসে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছিল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, মে মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বাড়ার অন্যতম কারণ ছিল কোরবানির ঈদ এবং ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে অস্থিরতা। জুনে এই অর্থের পরিমাণ কমলেও তা বেশি নয়; আরও কমা দরকার ছিল। তবে ভবিষ্যতে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ আরও কমবে বলে আশা করছেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, আমানতের সুদহার বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ এবং নগদ অর্থ ঘরে রাখার তুলনায় ব্যাংকে রাখার আর্থিক সুবিধা এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।
সুদের হার বাড়ায় মেয়াদি আমানত ও বিভিন্ন সঞ্চয়ী পণ্যে ভালো রিটার্নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঘরে বড় অঙ্কের নগদ রাখলে চুরি, হারানো ও লেনদেনের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও থাকে।
গত জুনে ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ ৭৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। মে মাসে ছিল ২০ লাখ ৪১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। এক মাসে আমানত বেড়েছে ৩৮ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা বা ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে এবং ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি বাতিল করা হবে। নতুন আমানত সুরক্ষা আইনেও ব্যাংক অবসায়নের ক্ষেত্রে যোগ্য আমানতকারীদের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অর্থ দ্রুত ফেরতের বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, এসব উদ্যোগ ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে ধারণায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আমানত বাড়ছে মানেই ব্যাংক খাতের সব সমস্যা মিটে গেছে, এমনটা বলা যাবে না।
খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য, সুশাসনের ঘাটতি ও সম্পদের মান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন আমানত কতটা স্থায়ী এবং ব্যাংকগুলো তা কতটা নিরাপদ ও উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকারদের মতে, সুদহারের সীমা তুলে দেওয়ার পর আমানত সংগ্রহে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ভালো সুদের কারণে ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থের একটি অংশ আমানতে আসছে। তবে মোট আমানত বৃদ্ধির পুরোটা যে ঘরে থাকা নগদ টাকা ফেরার কারণে, তা বলা যাবে না। নতুন সঞ্চয়, সুদ যোগ হওয়া ও ব্যবসায়িক লেনদেনও এতে ভূমিকা রাখে।
ফলে ব্যাংকের বাইরে নগদ কমার প্রবণতা ইতিবাচক হলেও এর স্থায়িত্ব নির্ভর করবে ব্যাংক খাতের আস্থা, সুশাসন ও আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।