হোম > অর্থনীতি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

এক ব্যাংক, একই পদ তবু বেতন কম-বেশি

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা

সংকটগ্রস্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এখন এটি একটি ব্যাংক। তাদের ব্যবস্থাপনা একই, বোর্ডও এক। কিন্তু এই ব্যাংককে একই পদে একই কাজ করেও কেউ বেতন পাচ্ছেন বেশি, কেউ কম। এ নিয়ে ব্যাংকটির কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা।

জানতে চাইলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান গতকাল বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ৫টি আলাদা ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। ফলে এখানে বেতনকাঠামোও ভিন্ন। আমরা চেষ্টা করছি নতুন একটি মডেল দাঁড় করাতে, যেখানে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সন্তুষ্ট করা যায়। শিগগির এ বিষয়ে একটি ফলাফল সবাই দেখতে পাবে।’

এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করেই সরকারি ব্যাংক হিসেবে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে তফসিলি ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। বর্তমানে ব্যাংকটির কর্মীসংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি।

কর্মীদের অভিযোগ, একীভূত হওয়ার পর পাঁচটি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী একই প্রতিষ্ঠানের জনবল হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু বেতন- ভাতার ক্ষেত্রে এখনো বহাল রয়েছে সাবেক ব্যাংকভিত্তিক পৃথক কাঠামো। ফলে একই পদে কর্মরতদের বেতনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। বিশেষ করে জুনিয়র অফিসার থেকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বেতন ব্যবধান ১৫-৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। তাঁদের প্রশ্ন, একই গ্রেড, একই দায়িত্ব, একই অফিস এবং একই ব্যবস্থাপনার অধীনে কাজ করার পরও একজন কর্মী বেশি এবং অন্যজন কম বেতন পাবেন কেন?

বেতনবৈষম্যের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আগের পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার দিকে তাকালে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার আগে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯৬ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৮ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৬২ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ ব্যাংকের ঋণ, আমানত, আর্থিক সংকট ও পুনর্গঠনের দায়িত্ব এখন একই প্রতিষ্ঠানের ওপর। কর্মীদের বক্তব্য, ব্যাংকের সংকট ও দায়িত্ব যদি সম্মিলিত হয়, তাহলে কর্মীদের বেতনকাঠামোও অভিন্ন হওয়া উচিত।

এক্সিম ব্যাংকের কর্মীদের দাবি, সম্মিলিত ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখতে তাঁরা নিয়মিত ঋণ আদায়, আমানত সংগ্রহ ও ধরে রাখা এবং গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ একই প্রতিষ্ঠানের অন্য চারটি ব্যাংকের কর্মীদের তুলনায় তাঁদের বেতন কম। তাঁদের ভাষ্য, একীভূত ব্যাংকের আয় ও কার্যক্রমের ওপর সবাই নির্ভরশীল হলেও বেতনকাঠামোয় এখনো পুরোনো ব্যাংকভিত্তিক বিভাজন রয়ে গেছে।

কর্মীদের দাবি, পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বেতনকাঠামো সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকায় বৈষম্যের অনুভূতি আরও তীব্র হয়েছে।

কর্মীদের মতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সম্প্রতি একটি সভায় চলতি মাস থেকে সম্মিলিত ব্যাংকের আইডি কার্ড এবং অভিন্ন বেতন-ভাতা চালুর বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট পর্যায় থেকেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া এগিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে এসে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর আপত্তি বা ভিন্নমতের কারণে অভিন্ন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, আগামী রোববার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় বেতনকাঠামোর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। তাই ব্যাংকের কর্মীরা চান, সেখানে অভিন্ন বেতনকাঠামোর বিষয়টি যেন চূড়ান্ত করা হয়।

কর্মীরা বলছেন, তাঁরা কোনো বিশেষ সুবিধা বা অতিরিক্ত বেতন দাবি করছেন না। তাঁদের দাবি, একই পদ, একই গ্রেড, একই দায়িত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ ও অভিন্ন বেতনকাঠামো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম। এখন আমরা একই পদে একই কাজ করছি। অথচ অন্য ব্যাংকের তুলনায় কম বেতন পাচ্ছি। এটা আমাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ৫টি ভিন্ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এখন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে একই ব্যাংকে ভিন্ন ভিন্ন বেতনকাঠামো থাকলে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো বৈষম্য দেখতে চায় না।