হোম > অর্থনীতি

বিল-বন্ডের মেয়াদপূর্তি: পৌনে তিন লাখ কোটি টাকার ব্যবস্থাপনার চাপে সরকার

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা

ঘাটতি থাকায় সরকারকে প্রতিবছরই ঋণ করে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হয়। আবার সেই ঋণ শোধও করতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এমন পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদ পূর্তি হচ্ছে। এতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মোট ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিল, যার পরিমাণ ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এটা সর্বোচ্চ।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বিপুল অঙ্কের স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণের একসঙ্গে বা কাছাকাছি সময়ে মেয়াদপূর্তি হলে সরকারের নগদ ব্যবস্থাপনা ও ঋণ পুনঃ অর্থায়নের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে মেয়াদপূর্তির পুরো অর্থ নতুন করে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে হবে, এমনটি অবধারিত নয়। সরকারের রাজস্ব, নগদ স্থিতি এবং নতুন ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে অর্থায়ন কৌশলের ওপর প্রকৃত চাপ নির্ভর করবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারি সিকিউরিটিজ সাধারণত রিনিউ করা হয়। অর্থাৎ একজনের মেয়াদপূর্তির টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য অন্য কারও কাছে নতুন বন্ড বিক্রি করা হয়। ফলে ঋণ করে ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে বিদ্যমান স্টকটি বজায় থাকে। তবে ঘাটতি যদি চলতেই থাকে এবং নতুন অতিরিক্ত ঋণ যোগ হতে থাকে, তাহলে আর্থিক চাপ তৈরি হবে এবং নতুন সুদও যোগ হতে থাকবে।

মেয়াদপূর্তির সিংহভাগ ট্রেজারি বিল

ট্রেজারি বিল সাধারণত স্বল্পমেয়াদি সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হতে যাওয়া সরকারি সিকিউরিটিজের মধ্যে ট্রেজারি বিলের পরিমাণ ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের বিলের মেয়াদপূর্তির অর্থ হলো, সরকারকে অর্থবছরজুড়ে নিয়মিতভাবে স্বল্পমেয়াদি তহবিলের প্রবাহ ও বহিঃপ্রবাহ সামলাতে হবে। বিশেষ করে কোনো সময়ে বাজারে তারল্যসংকট দেখা দিলে বা সুদের হার বেড়ে গেলে নতুন করে ঋণ সংগ্রহের ব্যয়ও বাড়তে পারে। মেয়াদপূর্তির ঋণ পরিশোধের পর সরকারের একই সময়ে নতুন ঋণ সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

তবে বাজারে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে কিংবা সুদের হার বেড়ে গেলে সেই পুনঃ অর্থায়ন ব্যয়বহুল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকলে ঘন ঘন পুনঃ অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। এতে বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন, সুদের হার বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদার ওঠানামা সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি বন্ডেও বড় অঙ্কের চাপ

স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদপূর্তিও হচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ৭১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ পূর্ণ হবে, যা মোট মেয়াদপূর্তি সিকিউরিটিজের ২৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের পুনঃ অর্থায়নের সময় বাজারের সুদের হার বেশি থাকলে সরকারের ভবিষ্যৎ সুদ ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে শুধু মূলধন পরিশোধ নয়, নতুন ঋণের সুদ ব্যয়ও মধ্য মেয়াদে সরকারি অর্থব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আছে সুকুক ও বিশেষ ট্রেজারি বন্ড

২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুকের মেয়াদ পূর্ণ হবে। শরিয়াহভিত্তিক এই সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদপূর্তিও সরকারের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনার অংশ। এ ছাড়া বিশেষ উদ্দেশ্য ট্রেজারি বন্ড বা এসপিটিবির প্রায় ১ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকার মেয়াদ পূর্ণ হবে, যা মোট মেয়াদপূর্তি দায়ের শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ।

সব মিলিয়ে মোট ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার সিকিউরিটিজের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া সরকারের ওপর সরাসরি একটি বড় আর্থিক ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এটিকে পুরোপুরি নতুন ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারণ, সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদপূর্তির পর মূল অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি সরকার চাইলে নতুন সিকিউরিটিজ ইস্যু করে তার একটি অংশ বা বড় অংশ পুনঃ অর্থায়ন করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের চাহিদামতো ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলাম অনুষ্ঠিত করা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নিয়মিত কাজ। চলতি অর্থবছর এই ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মেয়াদপূর্তির পরিমাণ অন্যান্য বছরের তুলনায় একটু বেশি হলেও এর অধিকাংশই পুনঃ অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ এতে নতুন ঋণের প্রয়োজন হবে না।