এমসিসিআইয়ের ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরেছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাপ এখনো কাটেনি। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে গতি নেই, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় থমকে আছে। রাজস্ব আদায় ও সরকারি উন্নয়ন ব্যয়েও রয়েছে চাপ। ফলে বৈদেশিক খাত কিছুটা শক্তিশালী হলেও অর্থনীতির ভেতরের চিত্র এখনো নাজুক।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) তাদের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির মতে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এই পুনরুদ্ধার টেকসই করতে মূল্যস্ফীতি কমানো, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো জরুরি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে তা ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা গতি ফিরেছে। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি এখনো কম বলে মনে করছে এমসিসিআই।
মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তি এলেও চাপ রয়ে গেছে। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুনে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও জ্বালানির দামের চাপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
বৈদেশিক খাতের চিত্র তুলনামূলক ভালো। এপ্রিল-জুন সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, মে শেষে যা ছিল ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে।
কিন্তু রপ্তানিতে সেই স্বস্তি নেই। পুরো অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। নিট এফডিআই ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ কমে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমেছে।
অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতাও স্পষ্ট। জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়ের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। একই সময়ে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমেছে ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এমসিসিআইয়ের মূল্যায়ন হলো, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা দিলেও পুনরুদ্ধারের গতি বাড়াতে ভেতরের দুর্বলতা কাটাতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগে গতি ফেরানো এখন সবচেয়ে জরুরি। বৈদেশিক খাতের স্বস্তি অর্থনীতির জন্য ভিত্তি তৈরি করলেও, তা এখনো ভেতরের দুর্বলতা কাটানোর মতো শক্তিশালী হয়নি। বিনিয়োগ না বাড়লে, ঋণের প্রবাহ না ফিরলে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে পুনরুদ্ধারের গতি ধরে রাখা কঠিন হবে।