আলুর টানা উদ্বৃত্ত উৎপাদন, বাজারদর কমে যাওয়া এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ)। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ঋণ, বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ ছাড় এবং আলু রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর পল্টনে বিসিএসএর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, টানা দুই বছর দেশে আলুর উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়, যা দেশের চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ লাখ টন বেশি। চলতি বছরও উৎপাদন হয় প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টন, যা চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ টন বেশি। দুই বছরে দেশের ৩৫১ হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বিসিএসএর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ টনের বেশি আলু বিভিন্ন হিমাগারে অবিক্রীত অবস্থায় ছিল। বাজারদর কম থাকায় মালিকেরা এসব আলু উত্তোলন করেননি। এতে একদিকে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাননি, অন্যদিকে হিমাগারমালিকেরাও সংরক্ষণ ভাড়া আদায় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
সংগঠনটির দাবি, পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ভাড়ায় হিমাগার পরিচালনা অলাভজনক হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সরকারনির্ধারিত আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া প্রতি কেজি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা। অথচ একটি ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার হিমাগারে শুধু বিদ্যুৎ বিল এবং ব্যাংকঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধেই প্রতি কেজিতে প্রায় ৭ টাকা ১১ পয়সা ব্যয় হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অ্যামোনিয়া গ্যাস, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যোগ করলে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি কেজি ৯ টাকা ৬২ পয়সা।
বিসিএসএর অভিযোগ, ১ জুন থেকে হিমাগারে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ট্যারিফ ১৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, লুব্রিকেন্ট, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু সরকারনির্ধারিত সংরক্ষণ ভাড়া অপরিবর্তিত রয়েছে। এ কারণে বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে আলু রপ্তানিতে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া হলেও তা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য যথেষ্ট নয়। উদ্বৃত্ত আলু রপ্তানি বাড়াতে এ প্রণোদনা ৩০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হিমাগারশিল্পকে কৃষি খাতের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন এবং সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।
সংগঠনটি কৃষকদের স্বার্থে আলুচাষিদের কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনা এবং সরকারের ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) এবং রেশনিং কার্যক্রমে আলু অন্তর্ভুক্ত করারও প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, এতে উদ্বৃত্ত আলুর ব্যবহার বাড়বে, বাজারের চাপ কমবে এবং কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে হিমাগারমালিকদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও নাকচ করা হয়। বিসিএসএর দাবি, সরকারনির্ধারিত ৬ টাকা ৭৫ পয়সার বেশি ভাড়া কোনো হিমাগার নেয়নি। কিছু ব্যক্তি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে কৃষক ও প্রশাসনকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করছেন।