ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড খেলাপি ঋণের চাপ এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। খেলাপি ঋণ এখন শুধু আদায় সংকটেই থেমে নেই; বরং ব্যাংকের আয়, আর্থিক সুরক্ষা, মূলধন ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সবকিছুর ওপরই একসঙ্গে নেতিবাচক চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে আয় কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না কয়েকটি ব্যাংক। এতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।
চলতি বছর জুন প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এরই মধ্যে দেশের সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি এসব ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ ও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণের প্রভাব এখন ব্যাংকের ব্যালান্সশিট ছাড়িয়ে সামগ্রিক কর্মকাণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ছে। তথ্যমতে, চলতি বছর জুন প্রান্তিক শেষে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এমন উচ্চমাত্রাই মূলত সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আয় ও প্রভিশন ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত দেড় দশকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার বড় অংশ এখন আর ফেরত আসছে না। এর প্রভাব পড়েছে সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণে। খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারা ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতে মূলধন ঘাটতিতে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ করায় কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণও বেড়েছে। কিন্তু আয় না থাকায় তারা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। নিয়ম অনুযায়ী, তারা মুনাফাও ঘোষণা করতে পারবে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। পাঁচটি সরকারি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।
বেসরকারি খাতের ১০ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ঘাটতি সর্বোচ্চ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি, এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ঋণের মান বিবেচনায় ব্যাংককে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কোনো ঋণ শেষ পর্যন্ত মন্দ ঋণে পরিণত হলে ব্যাংক যাতে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্যই এই সুরক্ষা ব্যবস্থা; যা ১৫ ব্যাংক ব্যাংক করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, এই ব্যাংকিং খাতে প্রভিশনের প্রয়োজনীয়তা ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। এই ক্ষেত্রে শুধু সমস্যাগ্রস্ত ১৫ ব্যাংকের হিসাবে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা দাঁড়ালেও কিছু ব্যাংক আবার লক্ষ্যের চেয়ে বেশি প্রভিশন রাখতে সমর্থ হয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতে সার্বিক হিসাবে প্রভিশন ঘাটতি কিছু কমেছে, দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায়।