বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি চাপে থাকলেও চামড়াশিল্প এখনো প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে সার্বিক পণ্য রপ্তানি কমলেও তুলনামূলক ভালো অবস্থান বজায় রেখেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ রপ্তানি খাতটি। তবে ডিসেম্বরে কিছুটা হোঁচট খাওয়ায় এই প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে চামড়া খাত থেকে বছরে প্রায় সোয়া বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। সবশেষ গত অর্থবছরে এ খাত থেকে মোট ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ৬ মাসে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। শুধু ডিসেম্বর মাসেই সার্বিক রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশের বেশি। এই মন্দার মধ্যেও চামড়া খাতের রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। যদিও নভেম্বর পর্যন্ত এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বরে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়েছে।
চামড়ার তৈরি জুতা, চামড়াজাত পণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত বা ফিনিশ লেদার—এই তিন ধরনের চামড়ার পণ্য মূলত দেশ থেকে রপ্তানি হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে এই তিন খাত মিলিয়ে মোট ৬১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৫৭ কোটি ৭২ লাখ ডলার।
এর মধ্যে রপ্তানিতে বড় অবদান চামড়ার তৈরি জুতার। ৬ মাসে এই পণ্য থেকে আয় হয়েছে ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বেল্ট, ব্যাগ, পার্স, হেডগিয়ারসহ বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্য। এ খাত থেকে ৬ মাসে রপ্তানি হয়েছে ১৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। তবে প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি কিছুটা কমেছে। এ সময়ে ফিনিশ লেদার রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ১৩ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ কম।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের জুতার প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন হলেও বর্তমানে মোট জুতা রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে।
লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সহসভাপতি মো. নাসির খান বলেন, চীন ও ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক বৃদ্ধির ফলে এসব দেশ থেকে অনেক অর্ডার বাংলাদেশে সরে আসছে, এটাই মূলত সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই খাতের প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
চলতি অর্থবছরের মাসভিত্তিক চিত্রেও ওঠানামা স্পষ্ট। জুলাইতে চামড়া খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঘটে ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আগস্টে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশে। সেপ্টেম্বরে তা আবার ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসে। এরপর অক্টোবরে এই প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং নভেম্বরে ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে ডিসেম্বরে এসে চামড়াশিল্প আবার ধাক্কা খায়। ওই মাসে মোট রপ্তানি হয় ৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ কম।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চামড়া খাতের রপ্তানির ভিত্তি তুলনামূলক ছোট হওয়ায় সামান্য অগ্রগতিও শতাংশের হিসাবে বড় হয়ে দেখা যায়। তাই এই প্রবৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট না হওয়াই ভালো। বরং অবকাঠামো ও বন্দর সুবিধা এবং পরিবেশগত সনদ অর্জনে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।