পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে—নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রত্যাশা জোরালো হয়। ছয় মাস পর সূচকে কিছুটা উত্থান দেখা গেলেও অন্য প্রধান সূচকগুলো সেই আশার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না। কমেছে বাজার মূলধন ও লেনদেন, কমেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ। এর সঙ্গে কারসাজি, দুর্বল কোম্পানি, ভালো শেয়ারের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট এখনো কাটেনি।
এর প্রমাণ বাজার মূলধনে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ১৬ হাজার ৮৪২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ছয় মাস পর ১৭ আগস্ট তা নেমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৫ হাজার ১৮৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকায়। এ সময়ে বাজার থেকে কমেছে ১১ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
অথচ একই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ২৪৩ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট। ১৭ ফেব্রুয়ারি ৫ হাজার ৫৭০ পয়েন্ট থেকে ১৭ আগস্ট সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮১৪ পয়েন্টে। সূচকের উত্থান বাজারের পুরো চিত্র দিচ্ছে না। সূচক বাড়লেও বাজারের মোট মূল্য কমেছে।
দৈনিক লেনদেনের চিত্রও সেই দুর্বলতা স্পষ্ট করছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ২২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ১৭ আগস্ট তা নেমে এসেছে ৯৯৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকায়। ছয় মাসে লেনদেন কমেছে ২২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। লেনদেন হাজার কোটি টাকার নিচে নেমে যাওয়ায় বাজারের তারল্য ও সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাজারের এই নিষ্প্রভতার সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরে যাওয়ার প্রবণতাও যুক্ত হয়েছে। ছয় মাসে তাদের বিও হিসাব কমেছে ১ হাজার ১০৩টি। মে পর্যন্ত আগের ১২ মাসে বিদেশিরা যত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তার চেয়ে বেশি তুলে নিয়েছেন। ফলে ওই সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ঋণাত্মক ছিল প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই অবস্থার পেছনে আস্থার সংকটকে বড় কারণ মনে করছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের অভাব রয়েছে। এতে আস্থা কমছে।
কারসাজি ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে। পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, বাজারে এখনো সংস্কার হয়নি, কারসাজি চলছে এবং ভালো শেয়ার আসছে না। এসব কারণে বাজার ভালো হচ্ছে না।
নতুন কমিশন সুশাসন, নজরদারি ও আস্থা ফেরাতে উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির কথা বলা হয়েছে। তবে আগের কমিশনের সময় প্রায় দুই বছরে অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনায় আরোপ করা ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানার বিপরীতে আদায় হয়েছিল মাত্র ৩৩ লাখ টাকা। সেখানেও আর গতি নেই। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এর মধ্যে বাজারে তারল্য বাড়াতে মার্জিন ঋণ সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ নিয়েও দ্বিমত আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, মৌলভিত্তি শক্তিশালী না করে ঋণনির্ভর বিনিয়োগ বাড়ানো হলে বাজারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। দরপতনের সময় ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, বাজারে ভালো কোম্পানির ঘাটতিও দীর্ঘদিনের সমস্যা। মানসম্পন্ন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ বা দুর্বল অবস্থায় থাকা কোম্পানিগুলো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ৫০০ কোম্পানির মধ্যে ২০০টিরও মৌলভিত্তি নেই। ভালো কোম্পানি আসার পরিবর্তে পাঁচটি ব্যাংক ও তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আরও কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও খারাপ। ফলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো ভালো শেয়ার বাজারে নেই।
আস্থার সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম। সম্প্রতি একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ পুরো বাজারব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল হয়। এরই মধ্যে ২২টি ব্রোকারেজ হাউস বন্ধ হয়েছে।