স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের আগে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি শুল্ককাঠামো তৈরি করা, যা একদিকে দেশীয় শিল্পকে অযথা সুরক্ষার আড়ালে রাখবে না, অন্য দিকে হঠাৎ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখেও ফেলবে না। অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট সময়সীমা, পূর্বানুমেয় নীতি ও পর্যায়ক্রমিক সংস্কার।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। ‘বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির সন্ধিক্ষণ: জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ ও আগামী প্রজন্মের বাণিজ্য চুক্তির প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সেমিনারটি পিআরআই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নোরা ডিহেল। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে গড় নামমাত্র শুল্কহার ১৫ শতাংশ। তবে সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ মোট শুল্কহার ২২ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে এটা অনেক বেশি। যেমন জুতায় শুল্কহার ৭০ শতাংশ, চামড়ায় ৬৭ শতাংশ ও পরিবহনের যন্ত্রপাতিতে ৩৬ শতাংশ। এসব শুল্ক কমালে স্বল্প মেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় কমতে পারে ১০০ কোটি ডলার। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুল্ক কমালে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা সহজ হবে। এতে ৪০০ কোটি ডলারের মূল্য সংযোজনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে বিষয়টির সঙ্গে একমত হতে পারেননি অর্থনীতিবিদেরা। আলোচনায় অংশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, মুক্ত বাণিজ্য থেকে অতিরিক্ত আয়ের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তা উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। তৈরি করতে হবে সক্ষমতা। আর কীভাবে শুল্ক আয়ের ঘাটতি পূরণ করা হবে, সেটার সঠিক পরিকল্পনাও উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়নি। শুল্ক হ্রাসের প্রভাব কেমন হতে পারে, সেটাও দেখা উচিত।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতি জোরদার হচ্ছে। শুল্কহার উল্টো বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে শুল্ক কমানোর প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সংস্কার করতে হবে।
বিভিন্ন দেশ শুল্ক বাড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করেন গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, জি-২০ দেশগুলো এখন শুল্ক বাড়াচ্ছে। শুধু শুল্ক সুবিধার ওপর রপ্তানি নির্ভর করে না। পণ্যের মান ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বিষয় যুক্ত রয়েছে।
তবে শুল্ক হ্রাসের বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরেন পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের শুল্কহার ৭ শতাংশের মতো হওয়া উচিত; কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক মিলিয়ে তা ২৮ শতাংশ হয়ে যায়। শুল্ক কমানো না হলে দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না।
পিআরআইয়ের সম্মানীয় সদস্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বাড়িয়ে তাদের বাণিজ্য-ঘাটতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই শুধু বাণিজ্যনীতি দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নতুন পথ তৈরি করতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘১৯৯৭ সাল থেকে মুক্ত বাণিজ্যের কথা শুনছি, কিন্তু এটা কেন হচ্ছে না, সেটা নিয়ে আলাপ করা দরকার।’
শুল্ক কমানোর ফলে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, এলডিসি উত্তরণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। নতুন বাণিজ্য চুক্তি করার আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তাঁরা পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। আর শুল্ক বেশি হলেও বিদেশিরা এখানে রপ্তানি করছেন। মানে তাঁদের প্রতিযোগী সক্ষমতা আরও অনেক বেশি।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘শুল্ক কমানো হলে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থান কমে বেকারত্ব বাড়তে পারে। আমরা আর আগের মতো কর্মসংস্থান ছাড়া প্রবৃদ্ধি চাই না। শুল্কহার ধাপে ধাপে কমানো উচিত।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, এলডিসি উত্তরণ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা শুনলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চিন্তায় পড়ে যায়। এসব উঠিয়ে দিলে তারা ব্যবসা হারানোর আশঙ্কা করে।