গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিপত্তি যেন পিছু ছাড়ছেই না। কিছুদিন ধরে একটার পর একটা নতুন সমস্যার কথা প্রকাশ করছে সরকার। সবশেষ সমস্যা হিসাবে সামনে এসেছে এলএনজিবাহী কার্গোজাহাজ দেশে পৌঁছানোর সংকট। মেরামতের পর একটি ভাসমান টার্মিনাল সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলেও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনা এলএনজির কার্গো সময়মতো না আসায় নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রূপান্তরের সমস্যার কারণে টানা ১৫ দিনের গ্যাস-সংকটের পর মাত্র এক দিনের জন্য কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল। এবার তরল গ্যাসবাহী জাহাজ এসে না পৌঁছানোয় অনিশ্চয়তায় পড়েছে এলএনজি সরবরাহ। উৎপাদন কার্যক্রম চরম সংকটে পড়া শিল্পকারখানার অচলাবস্থা তাই শিগগির কাটছে না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাপ্তরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান আজকের পত্রিকাকে গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ দিনের সংকটের পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে একদিন ভালোমতো গ্যাস পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় দিন থেকেই গ্যাস কমে গেল, আর আজকে নেই বললেই চলে। বিটিএমএর ১৮০০ সদস্য কারখানাতেই এই পরিস্থিতি।’
দেশের একটি সুপরিচিত ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক জানান, তিনি গতকাল পেট্রোবাংলায় গিয়ে গ্যাস-সংকট নিয়ে আলোচনা করে এসেছেন। প্রয়োজনে রেশনিং করে হলেও যেন গ্যাস দেওয়া হয়, সেই অনুরোধ করেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, পেট্রোবাংলার আওতাধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডই (আরপিজিসিএল) বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কার্গো জাহাজে করে আমদানির দায়িত্ব পালন করে।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘হুট করে গ্যাসের সংকট দেখা দিলে দ্বিগুণ ক্ষতি হয়। অন্তত আগে থেকে জানিয়ে রাখলে সেভাবে অর্ডার নেওয়া ও উৎপাদন পরিকল্পনা সাজানো যায়।’
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্কিন মালিকানার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দেওয়ার মতো কার্গো তাদের হাতে নেই। আপাতত দেশি প্রতিষ্ঠান সামিটের টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
চলতি আগস্টের শুরুতে সরকার নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহকারকদের বাইরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৬ কার্গো এলএনজির ক্রয়াদেশ চূড়ান্ত করেছিল। সেই বিক্রেতারা এসব কার্গো সময়মতো সরবরাহ না করায় এখনকার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সংকট সমাধানে সরকার গত সোমবার বিকেলে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে আরও ৫ কার্গো এলএনজি আমদানির চেষ্টা করে। বিপি সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট ২১ দশমিক ৮৭৮ ডলার মূল্যে ২৩-২৪ আগস্টের জন্য এক কার্গো এলএনজি সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে। এরপর ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর প্রতি ইউনিট ২১ দশমিক ৭৭৮ ডলার মূল্যে আরেক কার্গো এলএনজি দেবে তারা। দরপত্রে চাওয়া বাকি ৩ কার্গোর জন্য ভালো দরপ্রস্তাব পাওয়া যায়নি। সোমবার রাতে জুমে ক্রয় কমিটির বিশেষ বৈঠক করে এই প্রস্তাব অনুমোদন করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এলএনজি কার্গোর সংকট কখন দূর হবে জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব জিয়াউল হক বলেন, এ বিষয়ে তিনি পরে কথা বলবেন। আর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ফোন করা হলে তাঁরা কল ধরেননি।
অগ্নিকাণ্ডের কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের একটি বয়লার বন্ধ রাখা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল। এটি চালু করতে হলে পুরো টার্মিনাল ৭২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করতে হবে বলেও জানিয়েছিলেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু সোমবার পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারই চালু করা গেছে। কিন্তু এলএনজির চালান না থাকার কারণে গ্যাস সরবরাহ বাড়েনি।
এদিকে নিম্নচাপের প্রভাবে সারা দেশের আকাশ মেঘলা থাকায় এবং বৃষ্টিপাত হতে থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশ কমে এসেছে। ফলে মাত্র ১৩ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেও পরিস্থিতি একরকম সামাল দেওয়া যাচ্ছে। গতকাল দিনের অধিকাংশ সময়জুড়ে লোডশেডিং ৫০০ মেগাওয়াটের কম ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।