হোম > অর্থনীতি

পুঁজিবাজারে গুজব-আতঙ্ক: বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার বিক্রির চাপ, ক্রেতা কম

মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা

দেশের পুঁজিবাজারে এখন গুজব, অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট সমান্তরাল রেখায় চলছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর আচরণও বেশ অস্থির হয়ে উঠছে। সপ্তাহের বেশির ভাগ কার্যদিবসে বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দরপতনের পরিস্থিতি তাঁদের শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। দফায় দফায় দর হারানো শেয়ার থেকে অল্প কিছু পুঁজি হলেও ধরে রাখতে নিচ্ছেন তাৎক্ষণিক বিক্রির সিদ্ধান্ত। গোটা বাজারেই এখন একই চিত্র। এতে করে একদিকে শেয়ার বিক্রির চাপ তীব্র হয়ে উঠছে, অন্যদিকে নতুন করে শেয়ার কেনার আগ্রহী ক্রেতাও কমছে। এসবের প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন সূচক, বাজার মূলধন ও লেনদেনে।

চলতি সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র এক দিন সূচক বেড়েছে। বাকি চার দিনই হয়েছে দরপতন। এতে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এক সপ্তাহে ১৪৬ দশমিক ৯২ পয়েন্ট কমে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে।

একই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৫ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। দৈনিক গড় লেনদেনও নেমে এসেছে ৫৫৪ কোটি ২৫ লাখ টাকায়, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ কম।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা, উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা, ভালো কোম্পানির নতুন শেয়ারের ঘাটতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ—সব মিলিয়ে বাজারে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা গুজব। ফলে অনেকে খবরের সত্যতা যাচাই না করেই শেয়ার বিক্রি করছেন।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আল-আমিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, এই পরিস্থিতিতে শুধু দরপতন ঠেকানো নয়, বিনিয়োগকারীদের ভয় ও বিভ্রান্তি দূর করাই এখন বেশি জরুরি। আস্থা ফিরলে ক্রেতা ফিরবে, আর ক্রেতা ফিরলে লেনদেন ও বাজারের প্রাণচাঞ্চল্যও ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।

শিল্প খাতের কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আসন্ন আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ডিএসইর তথ্যও বাজারের সেই দুর্বল অবস্থারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৫টির দর কমেছে। প্রকৌশল খাতের ৪২টির মধ্যে কমেছে ৩৭টির এবং সাধারণ বিমা খাতের ৪৩টির মধ্যে ৩৮টির।

শুধু কোম্পানির ব্যবসা ও মুনাফা নিয়ে উদ্বেগ নয়, বাজারের নিয়মকানুন নিয়েও নানা আলোচনা ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ডিবিএ ও ডিএসই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে বিএসইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের নজরদারিতেও সন্দেহজনক লেনদেন ধরা পড়েনি।

এর মধ্যেই বাজারে বিনিয়োগ -সিদ্ধান্ত অনেকটা ‘শুনলাম’ নির্ভর হয়ে পড়েছে। কোনো কোম্পানি নিয়ে নেতিবাচক খবর ছড়ালেই অনেকে শেয়ার বিক্রি করছেন। আবার ইতিবাচক গুঞ্জন ছড়ালে যাচাই ছাড়াই কেনার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। বাজারের দুর্বলতার চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে ব্রেডথে। অর্থাৎ দর কমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি।

দরপতনের চাপ ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ওপরও পড়েছে। লেনদেন কমে যাওয়ায় কমছে কমিশন আয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্রোকারেজ হাউসের মালিক বলেন, দরপতনের চেয়ে বড় সমস্যা এখন আস্থার সংকট। বিনিয়োগকারীরা টাকা নিয়ে বসে থাকলে ভালো কোম্পানির শেয়ারও ক্রেতা হারাবে। এতে লেনদেন কমার পাশাপাশি ব্রোকারদের আয়ও কমবে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, গুজব বন্ধ করতে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ জরুরি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ছড়িয়ে শেয়ারদর প্রভাবিত করার চেষ্টা হলে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।